
খুলনা নগরের সোনাডাঙ্গা আন্তজেলা বাস টার্মিনাল। কিছুক্ষণ আগে একপশলা বৃষ্টিতে চারপাশ ভিজেছে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে কত মানুষের আনাগোনা, তার ইয়ত্তা নেই। এর মধ্যে টার্মিনালের লোহার গেট বরাবর দাঁড়ানো একটি ভ্যান চোখে পড়ল। ভ্যানের গায়ে লেখা ‘আলমগীর ভাইয়ের স্পেশাল টেস্টি লেবুর শরবত’। ভ্যানের ওপরের অংশ স্টিলের কাঠামো আর কাচ দিয়ে ঘেরা। এর ভেতর লেবুর শরবত বানানোর নানা উপকরণ।
ভ্রাম্যমাণ এই দোকানের মালিক মো. আলমগীর বাদশা (৩৬)। সেখানে দাঁড়িয়েই তাঁর সঙ্গে আলাপ জমল। কথা বলার ফাঁকে শরবত বানাচ্ছেন আলমগীর। তবে ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোয় নিজের মধ্যে অপরাধবোধ রয়েছে। মানুষের যাতায়াতে যেন বিঘ্ন না ঘটে, এ জন্য যতটা সম্ভব দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
আলমগীরের প্রতি গ্লাস লেবুর শরবতের দাম ৫ টাকা। আর শরবতে পাউডার মিশিয়ে দিলে দাম ১০ টাকা। স্বচ্ছ কাচের গ্লাসের মধ্যে লেবু চেপে রস দেওয়া হয়, পরে তাতে সামান্য বিট লবণ ও বরফ গলানো পানি দিয়ে তৈরি করা হয় শরবত। সেই শরবতেই তৃপ্তি মেটে পথচারীদের।
তবে সম্প্রতি জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকে বেচাকেনা কমে গেছে বলে জানালেন আলমগীর। আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘মানুষের কাছে টাকা নেই। তাই এখন মানুষ শরবত খেতে চাইছে না। যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন।’
আলমগীরের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায়। তাঁরা তিন ভাই। সবার ছোট আলমগীর। আট বছর বয়সে বাবা মারা যান। এরপর মায়ের সঙ্গে আলমগীর খুলনায় চলে আসেন। আলমগীরের মা অন্যের বাসায় কাজ শুরু করলেন। পেটের তাগিদে আলমগীরও কাজে নামলেন। গরুর রাখাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন তিনি। পরে একজনের পরামর্শে বাস টার্মিনাল এলাকায় শুরু করেন শরবত বিক্রি। ২২ বছর ধরে এ ব্যবসা চলছে।
আলমগীর বলেন, ‘২২ বছর ধরে শরবত বিক্রি করে মোটামুটি সংসার চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু এখন সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। জিনিসপত্রের যা দাম বেড়েছে, বাজারে গেলেই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। মাছ, মাংস তো কিনতেই পারছি না। সবজি ও ডিম দিয়েই চলছিল। কিন্তু ডিমেরও দাম অনেক বেশি। এখন সেটাও জুটছে না।’
করোনার দুই বছর বেচাকেনায় ভাটা পড়েছিল আলমগীরের। তখন সংসার চালাতে দুটি সমিতি থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এখন সেই ঋণের বোঝা টানতে হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে এক সমিতিতে ৭২৫ টাকা, অন্যটিতে ৬০০ টাকা করে জমা দিতে হয়। গত এক মাসে সেই টাকাও ঠিকমতো দিতে পারছেন না। এ জন্য দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন তিনি।
খুলনায় আলমগীরের নিজের বাড়ি নেই। পরিবার নিয়ে নগরের নাজিরঘাট এলাকায় একটি ভাড়া নিয়ে থাকেন। ঘরভাড়া ২ হাজার ৫০০ টাকা। মা এখনো বেঁচে আছেন। দুই মেয়ে ও দুই ছেলে নিয়ে মোট ছয়জনের সংসার। তিন ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করছে। সবচেয়ে ছোট সন্তানের বয়স এক বছরের মতো। মায়ের ওষুধ কেনা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, ঘরভাড়া—এসব খরচ চালাতে গিয়ে আলমগীর এখন হিমশিম খাচ্ছেন।
আলমগীরের শরবত বিক্রি নির্ভর করে গরমের ওপর। আলমগীর বলেন, যেদিন রোদ ও গরম বেশি পড়ে, সেদিন বেশি বিক্রি হয়। আগে গরমের দিনে গড়ে দেড় হাজার গ্লাসের মতো শরবত বিক্রি হতো। এখন সেটি এক হাজারে ঠেকেছে। অন্য সময় শীতে বিক্রি অর্ধেকে নেমে যায়। এবার যদি তেমন হয়, তাহলে পথে বসতে হবে। সব জিনিসের দাম বাড়ছে। প্রতি গ্লাস শরবতেও খরচ বেড়েছে। কিন্তু আগের দামেই শরবত বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ালে বেচাকেনা আরও কমার শঙ্কা আছে তাঁর।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমগীর বলেন, ‘কাউকে তো ফেলে দেওয়া যাবে না। সব কাস্টমারকে নিয়েই ব্যবসা করতে হবে। এখন এভাবেই কোনো রকমে বেঁচে থাকতে হবে।’