পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের দাবিতে রাঙামাটি জেলা বিএনপির কার্যালয়র সামনে বিএনপির নেতা–কর্মীদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ। আজ বিকেল সাড়ে পাঁচটায়
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের দাবিতে রাঙামাটি জেলা বিএনপির কার্যালয়র সামনে বিএনপির নেতা–কর্মীদের বিক্ষোভ ও  সড়ক অবরোধ। আজ বিকেল সাড়ে পাঁচটায়

পার্বত্য মন্ত্রীর হঠাৎ পদত্যাগ নিয়ে পাহাড়ে নানা আলোচনা, কী বলছেন নেতা–কর্মীরা

পাহাড়ের রাজনীতিতে এখন আলোচনায় সরকারের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ। দীপেন দেওয়ান কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা জানার চেষ্টা করছেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেতা-কর্মী এবং পাহাড়ের সচেতন মহল। পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও পুনর্বহালের দাবিতে তাঁর অনুসারীরা রাঙামাটিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, চাপ প্রয়োগের কারণে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দীপেন দেওয়ান। যদিও পদত্যাগপত্রে শারীরিক জটিলতা ও অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন দীপেন দেওয়ান। যুগ্ম জেলা জজের চাকরি ছেড়ে আসা দীপেন দেওয়ান এবার প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন তিনি।

বিএনপি সরকার গঠন করলে দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী করা হয়। তাঁর বাবা সুবিমল দেওয়ান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। তিনি ভূমি প্রতিমন্ত্রীও।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের বিষয়টি আগে থেকে আঁচ করতে পারেননি। তাঁদের ধারণা মন্ত্রণালয় পরিচালনা, রাঙামাটির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগপ্রক্রিয়ার জেরে দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করতে পারেন। তবে এ ব্যাপারে দীপেন দেওয়ানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পাহাড়ের তিন জেলাকেন্দ্রিক। এখানে তিনটি সংসদীয় আসন রয়েছে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান আসনের তিনটিতেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বান্দরবান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সাচিংপ্রু জেরী এবং খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য হচ্ছেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অন্তত ছয় নেতা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংসদীয় আসনগুলোর সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তিন সংসদ সদস্য একই দলের হওয়ায় তাঁদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। নানা কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থার সংকটও আছে। তাঁরা জানান, দীপেন দেওয়ান মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ শুরু করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান গত ১১ মে খাগড়াছড়ি জেলা সফরে যান। ওই দিন দুপুরে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। তবে ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন না স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া।

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর যোগাযোগ করা হলে ওয়াদুদ ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, পদত্যাগের কারণ জানা নেই। তবে অসুস্থতার কারণে ওই দিন ছিলেন না। দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে বিভক্তি ছিল। যদি নির্বাচনের সময় তা চাপা থাকে। বর্তমানে তা আবার প্রকাশ্য হতে শুরু করে। এক পক্ষে আছেন দীপেন দেওয়ানের অনুসারীরা। অন্য পক্ষে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারের অনুসারীরা।

দলীয় বিরোধের বিষয়টি ঠিক নয় বলে দাবি করেন দীপন তালুকদার। আজ সোমবার বিকেলে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মন্ত্রীর (দীপেন দেওয়ান) পদত্যাগের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। কী কারণে পদত্যাগ করেছেন, সেটি আমার জানা নেই। এটি একান্ত তাঁর (দীপেন দেওয়ান) ব্যক্তিগত বিষয়। আগে থেকে কোনো ইঙ্গিতও পাননি।’

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ বিএনপির রাজনীতি, পাহাড়ের রাজনীতি এবং পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের “রংধনু জাতি” গঠনের জন্য ক্ষতিকর। বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত ও ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে এটি প্রভূত ক্ষতি করবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান, যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ফেরত দিন।’

বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম ভুট্টো আরও বলেন, ‘দীপেন দেওয়ান শারীরিকভাবে অসুস্থ নন। দীর্ঘদিন প্রত্যন্ত অঞ্চলে তার সঙ্গে ঘুরেছি, কখনো তাকে দুর্বল বা অসুস্থ হতে দেখিনি। বিএনপির কিছু নেতা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।’

কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য সাজামং মারমা বলেন, ‘তিনি পদত্যাগপত্রে যে কারণ দেখিয়েছেন, তা সঠিক নয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি মন্ত্রিত্ব চালানোর মতো সক্ষম। গত ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে যারা লালন-পালন করছিল, তাদের চাপের মুখে তিনি সাময়িকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।’

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই। এর আগের বছর সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্তানুসারে এই মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। পাহাড়ে সংঘাত পেরিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনাই ছিল সেই চুক্তির লক্ষ্য।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ক, খ, গ ও ঘ খণ্ডে ৭২টি ধারা রয়েছে। এর বেশির ভাগই জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠনসংক্রান্ত। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের কথা বলা আছে। ওই ধারায় লেখা আছে, ‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন সংসদ সদস্যের মধ্যে দুজন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এবং অন্যজন বাঙালি। দীপেন দেওয়ান ছাড়া অন্য সংসদ সদস্য হলেন বান্দরবানের সাচিংপ্রু জেরি।