বৈঠা হাতে আব্দুর রহিম। গত মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার খেয়াঘাট এলাকায়
বৈঠা হাতে আব্দুর রহিম। গত মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার খেয়াঘাট এলাকায়

‘নৌকা বাইয়া যা পাই, তা দিয়া সংসার চলে না, কষ্ট অয়’

বয়সের ভারে ও অসুস্থতায় কাজে সায় দেয় না আবদুর রহিমের (৬৫) শরীর। তবু জীবন বাঁচাতে, সংসারের ঘানি টানতে এ বয়সেও নৌকায় বইঠা হাতে যাত্রী পারাপার করছেন। এতে যা আয় করেন, তা দিয়ে টেনেটুনে চালাচ্ছেন সংসার। খেয়ে–না খেয়ে, গতর খেটে ৩০ বছর ধরে এ কাজ করেই চলছে আবদুর রহিমের জীবনসংগ্রাম।

আবদুর রহিমের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার পশ্চিম বাইশপুর গ্রামে। ওই গ্রামের মৃত হজরত আলীর ছেলে তিনি। আবদুর রহিমের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে এখন তাঁর সংসার। ছেলেরা অনেকটাই বেকার। আবদুর রহিম ১৯৯৭ সাল থেকে নৌকায় করে যাত্রীদের ধনাগোদা নদী পারাপার করাচ্ছেন উপজেলার খেয়াঘাট এলাকায়।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় যাত্রী নিয়ে ধনাগোদার পশ্চিম পাড় থেকে পূর্ব পাড়ে খেয়াঘাট এলাকায় নৌকা ভেড়ান আবদুর রহিম। যাত্রীদের নামিয়ে সেখানে খানিকটা জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। ফাঁকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর জীবন–জীবিকার লড়াইসহ নানা দুঃখগাথা। উঠে আসে অভাব-অনটন ও শারীরিক অসুস্থতার কথাও।

আবদুর রহিম বলেন, তাঁর বাবার একমাত্র সন্তান তিনি। কৈশোরে বাবাকে হারান। এরপর সংসারের ভার এসে পড়ে তাঁর ওপর। কয়েক বছর দিনমজুরি করে সংসার চালিয়েছেন। বিয়ের পর সংসার বড় হয়। স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ের ভরণ-পোষণসহ সংসারের নানা খরচ মেটাতে হয়। দিনমজুরি ছেড়ে ১৯৯৭ সাল থেকে শুরু করেন মাঝিগিরি। ধনাগোদায় যাত্রী পারাপারের কাজ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নৌকা ও বইঠা হাতে কাটান সময়।

নদী পারাপারের জন্য প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে নেন পাঁচ টাকা করে নেন আবদুর রহিম। খেয়াঘাটের ইজারাদারকে প্রতিদিন দেন ৬০ টাকা। হাতে থাকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। ঝড়-তুফানের সময় কাজ বন্ধ থাকে। মাঝেমধ্যে শরীর অসুস্থ থাকলেও বন্ধ থাকে কাজ। মাসে ২২ থেকে ২৩ দিন নৌকা চালান। এতে মাসে রোজগার করেন সাড়ে ছয় হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা।

যাত্রীদের নদী পারাপার করাচ্ছেন আব্দুর রহিম। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার খেয়াঘাট এলাকায়

আবদুর রহিম বলেন, বাত, হৃদ্‌যন্ত্রের রোগসহ আরও নানা অসুখ তাঁর শরীরে। দুর্বলতাও থাকে সারাক্ষণ। প্রতি সপ্তাহে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার ওষুধ কিনে খান। নৌকা চালিয়ে যা আয় করেন, তা দিয়ে সংসার চলে না। ঋণ করে চলতে হয়। ঋণ না পেলে দোকানে বাকিতে নিত্যপণ্য কিনেন। কোনোরকমে খেয়ে–না খেয়ে জীবনটা টিকিয়ে রাখছেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে অন্য পেশায়ও যেতে পারছেন না।

মাঝি আবদুর রহিম বলেন, ‘যত কষ্টই হোক, সংসার বাঁচাইতে নৌকা-বইঠা ছাড়ুম না। গতর খাইটা চলছি। নৌকা-বইঠায়ই পার করুম বাকি জীবন। তয়, বাজারে জিনিসপত্রের দাম খুব বেশি। নৌকা বাইয়া যা পাই, তা দিয়া সংসার চলে না, কষ্ট অয়। তবু কারও কাছে হাত পাতুম না। এই কষ্টের কাম কইরাই খামু, চলুম।’

ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গোলাম নবী জানালেন, অনেক বছর ধরে ওই মাঝির নৌকায় করে নদী পারাপার হচ্ছেন। আবদুর রহিম মাঝিকে ভালোভাবেই চেনেন। নির্ধারিত ভাড়ার এক টাকাও বেশি নেন না। অসুস্থ শরীর নিয়ে এবং বয়সকে হার মানিয়ে তিনি যেভাবে নৌকা বেয়ে রোজগার করছেন, তা তাঁর লড়াকু মানসিকতার পরিচায়ক।