সচেতন নাগরিক সমাজ ও শহরের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ১০ বছর ধরে আধুনিক একটি মিলনায়তন নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে।
নেত্রকোনায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই। অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ছে জেলার সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। নেই নিয়মিত অনুষ্ঠান করার মতো কোনো মিলনায়তন। বহু দিন ধরে একটি মিলনায়তনের অভাব বোধ করছেন জেলার সংস্কৃতিকর্মীরা।
জেলা শিল্পকলা একাডেমিরও কোনো মিলনায়তন নেই। ফলে অনুষ্ঠান করতে হলে নির্ভর করতে হয় আধা পাকা, জরাজীর্ণ জেলা পাবলিক হলটিতে। আধুনিক সুবিধাবর্জিত ওই হলের ভাড়াও গুনতে হয় মাত্রাতিরিক্ত। এর ওপর নির্ভর করেই চলছে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম।
নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল্লাহ এমরান বলেন, তরুণ সমাজ এখন রাজনীতির দিকে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। তরুণ সমাজকে সংস্কৃতিমান করে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বহুকাল ধরে নেত্রকোনা সাংস্কৃতিক চর্চায় যথেষ্ট অগ্রসর। ১৯৩২ সালে শান্তিনিকেতনের বাইরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জন্মদিন উদ্যাপন করা হয় নেত্রকোনাতেই। প্রগতিশীল সংগঠন ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’ ঢাকার বাইরে ১৯৬৯ সালে প্রথম শাখা খোলে এ জেলায়। এখানে নাটক, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তির চর্চা করে ও প্রশিক্ষণ দেয়—এমন সক্রিয় সংগঠনের সংখ্যা ২৫-এর বেশি। যাত্রায় ও নাটকে নেত্রকোনায় বিশেষ খ্যাতি আছে।
সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি সংগঠনের মধ্যে সক্রিয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, শতদল সাংস্কৃতিক একাডেমি, শিকড় উন্নয়ন কর্মসূচি, প্রত্যাশা সাহিত্যগোষ্ঠী, নেত্রকোনা আবৃত্তি পরিষদ, রবীন্দ্র চর্চা কেন্দ্র, নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজ, বাতিঘর, ঝংকার, অগ্রান, তৃণ যোগ, নেত্রকোনা বাউল সমিতি প্রভৃতি। এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা বেশ কয়েকটি ব্যান্ডও গড়ে তুলেছেন। মিলনায়তনের অভাবে এসব সংগঠন অনুষ্ঠান করতে অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে।
শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি–সংলগ্ন একটি অডিটরিয়াম ছিল। ১৯৭৯ সালে পৌরসভার জায়গায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ‘মহুয়া অডিটরিয়াম’ নামের ভবনটি নির্মাণ করে। পরে শিল্পকলা একাডেমি জায়গাটি তাদের দাবি করে আদালতে মামলা করে। সর্বশেষ ভূমি জরিপে জায়গাটির বিআরএস সরকারের নামে চলে যায়। পরে এ নিয়ে পৌরসভা মামলা করে। এরই মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি জরাজীর্ণ হলে ১০ বছর আগে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। গত বছর পৌরসভা ভবনটি ভেঙে ফেলে।
পৌরসভার মেয়র মো. নজরুল ইসলাম খান বলেন, পুরোনো অডিটরিয়ামের জায়গাটি পৌরসভার পক্ষে রায় হয়েছে। সেখানে পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন অডিটরিয়াম নির্মাণ করা হবে।
শহরে মিলনায়তন মাত্র একটি। সেটা হলো জেলা পাবলিক হল। ১৯৬০ সালে নির্মিত আধা পাকা পুরোনো ঘরটি জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন। এতে নেই কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। চার শতাধিক লোকের ধারণক্ষমতা থাকলেও প্লাস্টিকের চেয়ার মাত্র ১০০টি। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সানওয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আট বছর ধরে শিল্পকলা একাডেমি অ্যাডহক কমিটি দিয়ে চলছে। এতে সংগঠনটির কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ছে।
জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন অচিরেই প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণ করা হবে। মোক্তারপাড়ায় শিল্পকলা একাডেমি-সংলগ্ন ভবনটি নির্মাণের জন্য মেয়রের সঙ্গে আলোচনা চলছে।