ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের পাঁচজনের সম্পদ কোটি টাকার ওপরে। অর্থাৎ এই পাঁচ প্রার্থীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ কোটি টাকার বেশি। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি সম্পদ কুমিল্লা-৯ আসনের প্রার্থী সৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকীর। তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকার। তবে এই প্রার্থীর দায়ও বেশি। সরওয়ার উদ্দিনের নামে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকার ব্যাংকঋণ রয়েছে।
প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম সম্পদ রয়েছে কুমিল্লা-১ আসনের প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান এবং কুমিল্লা-৭ আসনের প্রার্থী মো. মোশারফ হোসেনের। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে তাঁদের মোট সম্পদের পরিমাণ ৪২ লাখ ৭০ হাজার টাকার।
তবে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে সম্পদের পরিমাণ সবচেয়ে কম হলেও বার্ষিক আয়ে শীর্ষে রয়েছেন মো. মনিরুজ্জামান। এই প্রার্থীর বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ২৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা। সবচেয়ে কম ৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা আয় কুমিল্লা-৬ আসনের প্রার্থী কাজী দ্বীন মোহাম্মদের।
জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১০টি আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থীরা তাঁদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে হলফনামায় পরিপূর্ণ তথ্য না থাকায় ৩ জানুয়ারি কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনের প্রার্থী মো. ইউসুফ সোহেলের মনোনয়ন বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় কুমিল্লার ৯টি আসনের জামায়াতের প্রত্যেক প্রার্থী তাঁদের আয় ও সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেছেন। তাঁদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে পেশা হিসেবে ছয়জনই ‘ব্যবসার’ কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কুমিল্লা-১১ আসনের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের নিজের পেশা ‘ব্যবসা (চিকিৎসাসেবা)’ বলে উল্লেখ করেছেন। আর তিনজন নিজেদের পেশা ‘শিক্ষকতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন কুমিল্লা-৫ আসনের মোবারক হোসাইন, কুমিল্লা-৭ আসনে মোশারফ হোসেন এবং কুমিল্লা-৮ আসনের শফিকুল আলম (হেলাল)।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ১০ ধরনের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রার্থীর পেশা, আয়ের উৎস, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মামলাসংক্রান্ত তথ্য, প্রার্থীর নিজের ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদ বিবরণী। হলফনামা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রার্থীর সম্পর্কে ভোটারদের জানার সুযোগ তৈরি করা, যাতে ভোটাররা জেনেবুঝে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
এদিকে ১১ আসনের মধ্যে কুমিল্লা উত্তর জেলার সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম (শহীদ) কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জোট হওয়ায় দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। এই আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ।
কুমিল্লায় জামায়াতের প্রার্থী যাঁরা
কুমিল্লা-১ আসনে মো. মনিরুজ্জামান, কুমিল্লা-২ আসনে মো. নাজিম উদ্দিন, কুমিল্লা-৫ আসনে মোবারক হোসাইন, কুমিল্লা-৬ আসনে কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, কুমিল্লা-৭ আসনে মো. মোশারফ হোসেন, কুমিল্লা-৮ আসনে শফিকুল আলম (হেলাল), কুমিল্লা-৯ আসনে সৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী, কুমিল্লা-১০ আসনে ইয়াসিন আরাফাত এবং কুমিল্লা-১১ আসনে সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে দুজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী। তাঁরা হলেন মোবারক হোসাইন ও সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী। মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) পাস করেছেন চারজন। স্নাতক পাস করা প্রার্থী আছেন একজন। এমবিবিএস ডিগ্রিধারী আছেন সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। আর কুমিল্লা-৭ আসনের প্রার্থী মোশারফ হোসেনের পেশা শিক্ষকতা হলেও হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য নেই।
কোটি টাকার বেশি সম্পদ যাঁদের
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকীর স্থাবর ও অস্থাবর মোট সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকার। এরপরেই শফিকুল আলমের সম্পদ আছে ২ কোটি ১০ লাখ টাকার। সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার। ইয়াসিন আরাফাতের সম্পদ আছে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার। এ ছাড়া ১ কোটি ২৮ লাখ টাকার সম্পদ আছে মো. নাজিম উদ্দিনের।
বার্ষিক আয়ে এগিয়ে যাঁরা, পেশা থেকে আয় নেই দুজনের
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে মো. মনিরুজ্জামানের বার্ষিক আয় ২৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আয় শফিকুল আলমের। এ ছাড়া মোবারক হোসাইনের বার্ষিক আয় ২১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। কাজী দ্বীন মোহাম্মদ সবচেয়ে কম ৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা বার্ষিক আয় করেন।
জামায়াতের ৯ প্রার্থীর মধ্যে দুজনের নিজস্ব পেশা থেকে কোনো আয় নেই। পেশা ব্যবসা ও চিকিৎসাসেবা উল্লেখ করলেও এসব খাত থেকে সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের কোনো আয় নেই। বার্ষিক আয় হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি বছরে ১০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা সম্মানী পেয়ে থাকেন। কুমিল্লা-১ আসনের মো. মনিরুজ্জামানের বার্ষিক আয় সবচেয়ে বেশি হলেও প্রার্থীর পেশা ‘ব্যবসা’ থেকে তাঁর আয়ের কথা হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি।
হাতে নগদ টাকা বেশি যাঁদের
জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে হাতে নগদ টাকায় এগিয়ে আছেন সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তাঁর হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ৫১ লাখ ৮ হাজার টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা হাতে নগদ আছে মনিরুজ্জামানের। এরপরই ১২ লাখ ২১ হাজার হাতে আছে কাজী দ্বীন মোহাম্মদের। সবচেয়ে কম হাতে নগদ আছে মোশারফ হোসেনের। তাঁর হাতে আছে ৬৭ হাজার টাকা।
অস্থাবর সম্পদে এগিয়ে
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে এগিয়ে আছেন আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৮৫ লাখ টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ আছে সৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকীর। এরপরই মোবারক হোসাইনের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকার। সবচেয়ে কম অস্থাবর সম্পদ রয়েছে শফিকুল আলমের। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকার।