রিকশা, টাকা, খাবার পেল হালিমার পরিবার

হালিমার স্বামী স্বপন মিয়ার হাতে রিকশা তুলে দিচ্ছেন গোলাম দস্তগীর গাজী। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রূপগঞ্জ উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে
ছবি: প্রথম আলো

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দারিদ্র্যের কারণে নবজাতক সন্তানকে দত্তক দেওয়া প্রসূতি হালিমা আক্তারের পরিবারের মুখে হাসি ফুটেছে। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হালিমা আক্তারকে নগদ অর্থসহায়তা করেছেন। এ ছাড়া রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে নতুন রিকশা, এক মাসের খাবার, ফল এবং হালিমার তিন সন্তানসহ পুরো পরিবারের জন্য নতুন জামার ব্যবস্থা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রূপগঞ্জ উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে হালিমার স্বামী মো. স্বপন মিয়ার কাছে নগদ টাকা, নতুন রিকশা, খাবার ও নতুন জামা তুলে দিয়েছেন গোলাম দস্তগীর গাজী। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান ভূঁইয়া, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), মো. ফয়সাল হক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুল হাসান, কাঞ্চন পৌরসভা মেয়র রফিকুল ইসলামসহ রূপগঞ্জের বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

উপহার পেয়ে প্রথম আলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান স্বপন মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো দিন এত খুশি হই নাই। আমার স্ত্রী চিকিৎসা পাইতাছে, রিকশা পাইলাম, টাকা পাইলাম, সন্তানদের খাবার আর জামা পাইলাম। আরও অনেকে ফোন কইরা পাশে থাকার কথা দিছে। মনে হইতাছে আজকে আমার ঈদের দিন। আমি ঈদেও সন্তানদের নতুন জামা দিতে পারি নাই। আজ পারমু।’

উপহার তুলে দেওয়ার আগে গোলাম দস্তগীর বলেন, ‘বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ মানুষের জীবন পাল্টে দিতে পারে। একটি প্রতিবেদনের কারণে এতগুলো মানুষের জীবন পাল্টে গেল। ভবিষ্যতে যেন হালিমার পরিবারের দারিদ্র্যের মতো এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে আমরা সচেতন থাকব।’

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভূঁইয়া বলেন, ‘নিউজ আসার পর আমরা তদন্ত করে দেখলাম ঘটনা সত্য। তখন প্রথম আলোর প্রতি মন থেকে দোয়া এসেছে। আমরা এতটা গভীরে গিয়ে মানুষের প্রতি সব সময় লক্ষ রাখতে পারি না। গণমাধ্যম এভাবে করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করলে জনপ্রতিনিধিদের পক্ষেও কাজ করা সহজ হয়।’

ইউএনও ফয়সাল হক জানান, গোলাম দস্তগীরের পক্ষ থেকে নগদ টাকা, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবার ও জামা এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যক্তির অর্থায়নে হালিমার পরিবারকে রিকশা উপহার দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে হালিমার সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি উপজেলা প্রশাসন নজর রাখবে বলে তিনি জানান।

এ ছাড়া হালিমা আক্তার-স্বপন মিয়া দম্পতির দুঃখভরা জীবনের গল্প প্রথম আলোতে প্রকাশের পর দেশ-বিদেশ থেকে অনেক সাড়া মিলেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থা দরিদ্র পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এদিকে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন হালিমা আক্তারের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। বুধবার রাত থেকে তিনি নিজ থেকে উঠে দাঁড়াতে পারছেন। তাঁর পেট ও মেরুদণ্ডের ব্যথা কমেছে বলে হালিমা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।

হালিমার শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আইভী ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, ‘হালিমা পুরোপুরি সুস্থ আছেন। তাঁর শারীরিক দুর্বলতার কারণে আমরা তাঁকে আরও কিছুদিন হাসপাতালে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

হালিমা, স্বামী স্বপন মিয়া সঙ্গে তিন ছেলেমেয়ে

হালিমা আক্তার বলেন, ‘আমি এখন বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করছি। বাড়িতে ফিরেই সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করতে চাই। তারপর গ্রামে গিয়ে বাবার কবরটা দেখে আসব।’

এর আগে সোমবার হালিমার স্বামী স্বপন মিয়া জানিয়েছিলেন, তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। হালিমার বাবার বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরায়। দুজন ভালোবেসে বিয়ের পর স্বপনের পরিবার মেনে নেয়নি। এরপর থেকে হালিমাদের বাড়িতেই থাকতেন স্বপন। সেখানে রিকশা চালাতেন। তিন সন্তান আর তাঁরা স্বামী-স্ত্রী মিলে পাঁচজনের সংসার রিকশা চালিয়ে আর চলছিল না। কাজের খোঁজে স্বপন-হালিমা দম্পতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আসেন। দুই হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নেন। আট হাজার টাকা বেতনে একটি কারখানায় কাজ শুরু করেন স্বপন। ঠিকঠাক বেতন পাচ্ছিলেন না। কোনো রকমে খেয়ে না-খেয়ে থাকতে থাকতে ওই কাজ ছেড়ে দেন তিনি। দুই মাস ধরে তিনি দিনমজুর হিসেবে যখন যে কাজ পেয়েছেন, করেছেন। এর মধ্যে স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। এদিকে তিন মাসের বাড়িভাড়া বকেয়া পড়ে। মালিক ঘর ছাড়তে তাগাদা দিচ্ছেন।

সন্তান বিক্রির বিষয়ে সোমবার হালিমা বলেছিলেন, বিক্রি করেননি। অভাবের তাড়নায় একজনকে দত্তক দিয়েছেন। গত শনিবার মধ্যরাতে তাঁর প্রসবব্যথা শুরু হলে ধাত্রীর খোঁজ করা হয়। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি। হাসপাতালে ভাড়া দিয়ে যাওয়ার মতো টাকা তাঁদের ছিল না। তীব্র ব্যথার একপর্যায়ে স্বাভাবিকভাবে তিনি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। ভোরে এক দম্পতি এসে লালনপালনের জন্য নবজাতকটি নিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় একজন সংবাদকর্মীর সহায়তায় হালিমা রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন।

দত্তক দেওয়া নবজাতকের বিষয়ে কী ভাবছেন জানতে চাইলে আজ হালিমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা সন্তান নিচ্ছেন, তাঁরাও নিঃসন্তান। আমার দুঃসময়ে তাঁরা আশা কইরা মেয়েটারে নিয়া গেছে। এখন ফিরাইয়া নিয়া আসলে তাঁরাও কষ্ট পাইব। কী করমু এখনো সিদ্ধান্ত নিই নাই।’