লোডশেডিং
লোডশেডিং

চট্টগ্রামে লোডশেডিং

‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাড়ে ১০ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ ছিল না’

গ্যাস–সংকটে ভোগান্তির শেষ নেই গৃহিণী কোহিনূর বেগমের। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা। এত ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে, তাতে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। গরমের যন্ত্রণায় রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এই গৃহিণী।

চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকায় ভাড়া বাসায় স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে থাকেন কোহিনূর বেগম। ক্ষোভ প্রকাশ করে আজ মঙ্গলবার সকালে তিনি বলেন, ‘কারেন্টের (বিদ্যুৎ) কথা বলে লাভ নেই। কখন যায়-আসে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। একবার গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টায় আসে না। গ্যাসের কারণে রান্নাও ঠিকমতো করতে পারছি না। অন্তত বিদ্যুৎ থাকলে বিকল্প কিছু করা যেত। সেটিও পারছি না। এসব যন্ত্রণা অসহ্য লাগছে।’

শুধু গৃহিণী কোহিনূর বেগম নন, লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ এখন বন্দর নগর চট্টগ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা। দিনে ছয় থেকে আটবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একেকবার বিদ্যুৎ গেলে আসে আধা ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর। কিছু কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। এমন লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একদিকে বিদ্যুতের যন্ত্রণায় ভুগছেন, অন্যদিকে জুন মাসে বিদ্যুতের বিলও বেড়েছে।

জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় চট্টগ্রামে লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা। এখন দিনে গড়ে আড়াই থেকে তিন শ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যুতের পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তা বলতে পারছেন না কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, গ্যাস–সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে।

দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি ও অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে এলএনজি সরবরাহের একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাসের সংকট প্রকট হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও।

সারা দিন অফিস শেষে যখন বাসায় ফিরি, তখন বিদ্যুৎ থাকে না। একদিকে গ্যাস–সংকট, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের খাবার তৈরি করতে বেগ পেতে হয়।
আমরিন আলম, বাসিন্দা, আতুরার ডিপো, চট্টগ্রাম।

সাড়ে ১০ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ ছিল না

একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি করেন আমরিন আলম। চট্টগ্রাম নগরের আতুরার ডিপো এলাকায় বাসা। সারা দিন চাকরি করে সন্ধ্যায় বাসা ফেরেন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বাসা ফিরে দেখেন বিদ্যুৎ নেই। অফিসে থাকার সময়ও তিন থেকে চারবার লোডশেডিং হয়েছিল। বাসায়ও একই অবস্থা। গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্না নিয়ে কষ্টে আছেন এই চাকরিজীবী নারী। ভাত রান্নার জন্য রাইস কুকারে চাল বসান রাতে। কিন্তু হুট করে বিদ্যুৎ চলে যায়। এ কারণে ভাত রান্নাও হয়নি তখন।

আমরিন আলম বলেন, ‘ভোগান্তির কথা বলে শেষ করা যাবে না। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যায় না। পেলেও ভাড়া দাবি করে বেশি। শেষ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়ায় অফিসে যেতে হচ্ছে। সারা দিন চাকরি শেষে যখন বাসায় যখন ফিরি তখন বিদ্যুৎ থাকে না। একদিকে গ্যাস–সংকট, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের খাবার তৈরি করতে বেগ পেতে হয়।’

মোহাম্মদ শাহজাহানের যন্ত্রণা আবার অন্য রকম। পেশায় রিকশাচালক শাহজাহানের বাসা নগরের লালখান বাজারে। বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ শরীর নিয়ে রিকশা চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, বয়স ও অসুস্থতার কারণে রিকশা চালানো এখন অনেক কষ্টের। কিন্তু উপায় নেই। এই গরমের মধ্যেও রিকশা চালাতে হচ্ছে। সারা দিন রিকশা চালিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় এসে একটু শান্তিতে বিশ্রাম নেবেন, তারও উপায় নেই। এত ঘন ঘন লোডশেডিং হয়, গরমের কারণে ঘরেও থাকতে পারেন না।

চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড় এলাকায় বহুতল ভবনে অফিস একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। ভবনের নিজস্ব জেনারেটরের পাশাপাশি নিজেদেরও জেনারেটর রয়েছে অফিসে। দিনে কতবার বিদ্যুৎ যায়, তার হিসাব সংরক্ষণও করা হয়। ওই অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সোমবার সারা দিনে বিদ্যুৎ গেছে ১১ বার। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাড়ে ১০ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ ছিল না। একবার তো একটানা দুই ঘণ্টার বেশি সময় লোডশেডিং। এভাবে লোডশেডিংয়ের কারণে অফিসের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। জেনারেটর চালু রাখতে প্রচুর জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে আর্থিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।’

দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এর মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে ছয় হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি উৎপাদন করা হতো। গ্যাস–সংকটের কারণে এটি এখন চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে গেছে। তার মানে গ্যাস–সংকট থেকেই উৎপাদন কমেছে দুই হাজার মেগাওয়াট।

ঘাটতি ৩০০ মেগাওয়াট

দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এর মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে ছয় হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি উৎপাদন করা হতো। গ্যাস–সংকটের কারণে এটি এখন চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে গেছে। তার মানে গ্যাস–সংকট থেকেই উৎপাদন কমেছে দুই হাজার মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ২৩টি। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট।

চট্টগ্রামের রাউজানে অবস্থিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া বাকি সব কটি কেন্দ্র চালু আছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় উৎপাদন কমলেও তুলনামূলকভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বেড়েছে। গত রোববার বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছে না চট্টগ্রাম।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া গেছে ৯৫০ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৩০০ মেগাওয়াট। এখন এই ঘাটতির কারণে লোডশেডিং হচ্ছে। তবে কী কারণে বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন, তা তাঁর জানা নেই বলে জানান তিনি।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন দেশে গ্যাস–সংকট চলছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাস–সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি রয়েছে। তাই সরবরাহও কমেছে। গ্যাস–সংকট নিরসন হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’