কুড়িগ্রাম

বালুচরে সমৃদ্ধির ঝিলিক 

কয়েক বছর আগেও কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন চরে কোনো ফসল হতো না। কিন্তু এখন এসব চরে ধান, ভুট্টার পাশাপাশি বিভিন্ন সবজিও উৎপাদন করা হচ্ছে।

বালুচরের জমিতে শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিচ্ছেন এক কৃষক দম্পতি। সম্প্রতি কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র-ধরলা চরে
  ছবি: প্রথম আলো

‘আমার বাবা চরের সবচেয়ে ধনী কৃষক ছিলেন। তখন আমাদের গোয়ালভরা গরু, গোলাভরা ধান ছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালে ধরলা নদীর ভাঙনে আমাদের সব সম্পত্তি বিলীন হয়ে যায়। অভাবের কারণে দিনমজুরি করে সংসার চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছিলাম।  স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রায়ই অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হয়েছে বেশ কয়েক বছর। পরে ধরলার বুকে জেগে ওঠা বালুচরে পটোল, বেগুন ও ভুট্টা চাষ করে ধীরে ধীরে সংসারে সচ্ছলতার ফিরেছে।’

সম্প্রতি খেতের বেগুনগাছ পরিচর্যা করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক। তাঁর বাড়ি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চর সিতাইঝাড় গ্রামে। চরে এবার বেগুন ও পটোলের ফলন ভালো হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তা নদীবেষ্টিত জেলার সদর, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলার কয়েক শ চরে বিভিন্ন ফসলের ফলন ভালো হওয়ায় আবু বক্করের মতো প্রায় এক লাখ কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চর সিতাইঝাড়, বালাবাড়ি কলাপাড়া, নয়ারহাট, উলিপুর উপজেলার থেতরাই, গোড়াইপিয়া এবং চিলমারী উপজেলার চর শাখাহাতি, করাই বরিশাল ও আমতলী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর বুকে ধু ধু বালুচর সবুজে ভরে গেছে। বছরের ৯ মাস কুড়িগ্রামের এসব দুর্গম চরে নানা কৃষিশস্য ফলছে। শীতের সবজি শিম, বরবটি, পটোল, লাউ, মরিচ, পেঁয়াজ, ভুট্টা, ধানসহ নানামুখী কৃষিশস্য উৎপাদনের ফলে চরের কৃষকের ভাগ্য বদলে যাচ্ছে। অনেক অনাবাদি জমি চাষের আওতায় এসেছে। চরে কৃষিতে বিপ্লব ঘটে গেছে। 

সদর উপজেলার চর সিতাইঝাড় গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘এক একর জমিতে পটোল চাষ করতে চারা রোপণ, হালচাষ, মাচা নির্মাণ ও কৃষিশ্রমিকদের খরচ সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। তিন বছর আগে প্রতিবেশীর কাছে টাকা ধার করে ১ একর জমিতে পটোল চাষ করেন। সে বছর দাম ভালো থাকায় তাঁর ২ লাখ টাকা লাভ হয়। তারপরের বছর একই জমিতে পটোল চাষ করে দেড় লাখ টাকা লাভ করেন তিনি। লাভের টাকায় তিন একর জমি কিনেছেন। দুই ছেলেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ও এক ছেলেকে কামিল পাস করিয়েছেন। শখ করে কিনেছেন মোটরসাইকেল। পটোল চাষ আমার ভাগ্য বদলে দিয়েছে।’

নয়ারহাট গ্রামের কৃষক কেসমত আলী নিজের ৬০ শতক জমিতে বেগুন ও ২০ শতক জমিতে পটোল চাষ করেছেন। তিনি কৃষিকাজ করার পাশাপাশি বালাবাড়ি কলাপাড়া, চর সিতাইঝাড় গ্রামসহ আশপাশের গ্রাম থেকে সবজি কিনে পাইকারি দামে কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। তিনি জানান, ধরলা নদীর চরে কৃষক বেগুন, পটোল, করলা, লাউ, লালশাক, মুলা, ধনেপাতা, কাঁচা মরিচ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। তিন আরও বলেন, তিনি কৃষকদের কাছ থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে বেগুন কিনে স্থানীয় বাজারে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন। পটোলের মৌসুমে চর সিতাইঝাড়, নয়ারহাট, কলাপাড়াসহ ধরলা নদীবেষ্টিত বিভিন্ন চর থেকে তিনি পটোল কিনে জামালপুর ও ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করেন। 

চিলমারী উপজেলার শাখাহাতি চরে ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে এবার ১২ একর জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন রিপন মিয়া। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্রের ধু ধু বালুচরে আগে কোনো ফসল হতো না। কয়েক বছর থেকে বালুচরে ভুট্টা চাষ শুরু হয়েছে। ৬০ শতক জমিতে ভুট্টা লাগাতে খরচ লাগে ৪০ হাজার টাকা, সেখান থেকে ৮০ মণ ভুট্টা পাওয়া যায়। ৮০ মণ ভুট্টার দাম ৯৬ হাজার টাকা। তিনি গত বছর ৪ একর ৮০ শতক জায়গায় ভুট্টা চাষ করছিলেন। তখন ভুট্টার বাজারমূল্য প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ টাকা ছিল। সে বছর তাঁর প্রায় ৮ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। তার আগের বছর ৬ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। গত দুই বছরে ভুট্টার চাষ করে চিলমারী নদীর ওপারে জমি কিনেছেন।

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও ব্যবসায়ী আঙ্গুর মিয়া বলেন, বালুচরে একসময় কোনো ফসল হতো না। কোনো কোনো জমিতে সীমিত পরিমাণে গম আবাদ হলেও তা থেকে উৎপাদন ব্যয় বাদ দিলে কৃষকের কোনো লাভ থাকত। তিনি পাঁচ বছর আগে চরে প্রথম ভুট্টার চাষ শুরু করেন। ফলন ভালো হওয়ায় লাভ বেশি দেখে তাঁর মতো অনেক কৃষক ভুট্টা চাষ শুরু করেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি তিনি কৃষিপণ্যের ব্যবসাও করেন।

আঙ্গুর মিয়া আরও বলেন, ভুট্টা মৌসুমের সময় কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদিত সব ভুট্টা তিনি কেনেন। কৃষকের কাছে কেনা এসব ভুট্টা তিনি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। গত বছর তিনি ১ হাজার ৭৮২ মেট্রিক টন ভুট্টা কেনেন, যার বাজারমূল্য ৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। গত বছর ভুট্টা বিক্রি করে তাঁর প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে মোট কৃষক ৫ লাখ ৩ হাজার জন। এর মধ্যে চরাঞ্চলের কৃষক ৯৫ হাজার জন। এ বছর জেলার ৬২ হাজার চাষি ভুট্টা চাষ করেছেন। চলতি বছরে জেলায় ৬ হাজার ৫০০ জন চাষি ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করেছেন। গত বছরে এই সবজিচাষির সংখ্যা ছিল ৬৪ হাজার, সে বছর মোট ৭ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিপ্লব কুমার মোহন্ত জানান, জেলায় এবার ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। দুই বছর আগেও ভুট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৮৪৫ হেক্টর। আর ৭ হাজার ২৫০ হেক্টরে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এসব জমির অধিকাংশই ধু ধু বালুচরে। কুড়িগ্রামের চার শতাধিক চর মিলে প্রতিবছর ১২ হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকে, যা চাষাবাদের আওতায় এলে চরের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

কুড়িগ্রামের অন্যতম কাঁচাবাজার শহীদ জিয়া বাজার। এই বাজার থেকে জেলার অন্য সব উপজেলায় সবজি সরবরাহ হয়। শহীদ জিয়া বাজার ক্ষুদ্র বণিক সমিতির সহসভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শীতকালে প্রতিদিন আমরা এসব চরে উৎপাদিত ১ হাজার মণ  শিম, আলু, পটোল, বেগুনসহ অন্যান্য সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করি।’

চিলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কুমার প্রণয় বিষাণ দাস জানান, এ বছর উপজেলার বিভিন্ন চরে প্রায় ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা, ৪৫০ হেক্টর জমিতে শর্ষে এবং ৫৫০ হেক্টর জমিতে গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চরাঞ্চলগুলোয় শীতকালীন রবি শস্যের চাষাবাদ চলমান আছে। সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতি ইউনিয়নে ১০০ জন কৃষককে ১৫ শতক জায়গার জন্য বিভিন্ন শীতকালীন সবজি বীজ দেওয়া হচ্ছে। আগের তুলনায় বর্তমানে আমাদের কাছে যথেষ্ট সার রয়েছে। মাঠপর্যায়ে আমাদের মনিটরিং টিম আছে, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার দেওয়া হবে।

ফসল চাষের লক্ষ্যমাত্রা

কুড়িগ্রামের সদর, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলায় চার শতাধিক চর রয়েছে। বিভিন্ন ফসল চাষ করে এসব চরের এক লাখ কৃষক পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। শীতকালে প্রতিদিন এক কোটি টাকার সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। এখানে পুরো জেলার বিভিন্ন ফসল আবাদের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া আছে।

সূত্র: কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর