আলভীর সন্ধান চেয়ে এবং দালালের বিচার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তাঁর স্বজনেরা। বুধবার বিকেলে সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের কুন্তিপাড়া এলাকায়
আলভীর সন্ধান চেয়ে এবং দালালের বিচার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তাঁর স্বজনেরা। বুধবার বিকেলে সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের কুন্তিপাড়া এলাকায়

ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ তরুণ, ৪৩ লাখ টাকা দিয়েও হদিস মেলেনি

অবৈধভাবে ইতালিতে যাওয়ার পথে লিবিয়া থেকে মাদারীপুরের এক তরুণ নিখোঁজ হয়েছেন। ১৯ দিন ধরে তাঁর কোনো খোঁজ পাচ্ছে না পরিবার। এর আগে লিবিয়ার এক বন্দিশালা থেকে তাঁর মুক্তির জন্য নেওয়া হয় ২২ লাখ টাকা। নিখোঁজ তরুণের সন্ধান চেয়ে এবং দালালের বিচার দাবিতে আজ বুধবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন স্বজনেরা।

নিখোঁজ ওই তরুণের নাম আলভী খান (২৪)। তিনি সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের কুন্তিপাড়া গ্রামের এমদাদ হোসেন খানের বড় ছেলে।

নিখোঁজ তরুণের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আলভী। পার্শ্ববর্তী ডাসার উপজেলার ধুলগ্রাম এলাকার দালাল রাতুল হাওলাদারের প্রলোভনে পড়ে ইতালিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আলভীকে ২১ লাখ টাকায় ইতালিতে পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি করে দালাল চক্রটি।

পরে চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর তিন ভাগের এক ভাগ টাকা পরিশোধ করে আলভীর পরিবার। এর চার দিন পর ১৯ অক্টোবর আলভীকে আকাশপথে সৌদি আরবে নিয়ে যান দালাল চক্রের সদস্যরা। পরে সেখান থেকে লিবিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি দালাল চক্র তাঁকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় নিয়ে যায়। প্রথম তিন মাস লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন না করলেও কৌশলে আদায় করে নেওয়া হয় চুক্তির পুরো টাকা। টাকা নেওয়ার চার মাস পর আলভীকে নির্যাতন করে অডিও ভয়েস পাঠিয়ে পরিবার থেকে চাওয়া হয় মুক্তিপণ। বাধ্য হয়ে আলভীর পরিবার ৪ নভেম্বর বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ২২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেন। এরপর আরও মুক্তিপণ চাওয়া হলে অস্বীকৃতি জানায় তার পরিবার।

এরপর নিরূপায় হয়ে আলভীর বাবা এমদাদ হোসেন বাদী হয়ে ১৯ এপ্রিল অভিযুক্ত রাতুলসহ ছয়জনের নামে মানব পাচার দমন আইনে সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেন। পরে পুলিশের অভিযানে রাতুল গ্রেপ্তার হলেও আলভীর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

ছেলের সন্ধানের পাশাপাশি দোষীদের বিচার দাবিতে বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করেন আলভীর পরিবার। আলভীর মা মেরিনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে শেষবার শুধু ভয়েস দিয়ে কথা পাঠাইছিল। তখন বলেছিল, “আম্মু তুমি আব্বুরে কও, টাকা দিয়া দিতে, ওরা টাকা না দিলে মাইরা ফালাইবে।” আমার ছেলের মুক্তির জন্য ২২ লাখ টাকা তখন দালাল রাতুলের কাছে দিছি। এর আগে ২১ লাখ টাকা নিছে। তবু ওরা আমার ছেলেরে ইতালি পাঠাইল না। ১৯ দিন ধরে আমার ছেলের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না, আমি শুধু আমার ছেলের সন্ধান চাই।’

আলভীর বাবা এমদাদ হোসেন বলেন, ‘আজ ১৯ দিন ধরে আমার ছেলেডার কোনো খবর নাই। ওরে দালালরা কী করছে? আমাগো আর বিদাশ লাগব না। টাকাও চাই না। শুধু ছেলেডারে ফেরত চাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় দালাল রাতুল হাওলাদার (২৮) ডাসার উপজেলার বালিগ্রাম ইউনিয়নের ধুলগ্রামের সরোয়ার হাওলাদারের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। চক্রটি প্রথমে ডাসার ও সদর উপজেলার শতাধিক তরুণকে লিবিয়ার উপকূল থেকে নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছে দিয়ে সুনাম অর্জন করে। পরে তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রলোভন দিয়ে তরুণ ও যুবকদের লিবিয়া নিয়ে বন্দিশালায় আটকে রেখে বাংলাদেশ থেকেই তাঁরা মুক্তিপণের টাকা আদায় করে।

বর্তমানে রাতুল মাদারীপুরের কারাগারে আছেন। এ বিষয়ে তাঁর বাবা সরোয়ার হাওলাদার বলেন, ছেলের সঙ্গে তিনিও একই মামলার আসামি। নিখোঁজ আলভীকে তাঁর ছেলে রাতুল আটকে রেখে টাকা আদায় করেনি। রাতুল বিভিন্ন দেশের এজেন্সি হিসেবে কাজ করে। কোনো অন্যায় বা অবৈধ কোনো কাজ রাতুল করে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, আলভী নামের এক তরুণকে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলায় মূল আসামি রাতুল হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে। একই সঙ্গে আলভীর সন্ধান নিশ্চিত করতেও পুলিশ কাজ করছে।