বসন্ত উৎসবে সংগীতের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করছেন একদল শিল্পী। আজ শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শিমুলবাগানে
বসন্ত উৎসবে সংগীতের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করছেন একদল শিল্পী। আজ শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শিমুলবাগানে

যাদুকাটা নদীর তীরে শিমুলবাগানে আজ বসন্ত উৎসব

‘বসন্তের ফুল যত, যাবো মোরা দুজনে কুড়াতে...’। আজ পয়লা ফাল্গুন, বসন্তকাল। শিমুলগাছ ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। ঝরা ফুলে লাল হয়ে আছে সবুজ ঘাসের জমিন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শিমুলবাগানের এমন দৃশ্য মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। বসন্তকে বরণ করে নিতে এখানে আজ দিনব্যাপী বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর পশ্চিম পাড়ে মানিগাঁও এলাকায় এই শিমুলবাগানের অবস্থান। যাদুকাটা নদীর তীর ঘেঁষে থাকা এই বাগান এখন অনেকের কাছে প্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। এখানে এলে একই সঙ্গে হাওর, নদী, পাহাড়ের দেখা মেলে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি ২০২৩ সাল থেকে সুনামগঞ্জের চোখজুড়ানো এই শিমুলবাগানে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে আসছে।

জেলা সংস্কৃতি কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী জানালেন, বেলা ১১টায় উৎসবের উদ্বোধন করেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে সই গো...’ গানের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। এবার উৎসবে সুনামগঞ্জের প্রায় ২০০ শিল্পী অংশ নিয়েছেন। সংগীত, নৃত্য, কবিতা, আদিবাসী ও পাহাড়ি নৃত্য, বাউল গানসহ লোক–ঐতিহ্যের সব আয়োজন জমে উঠেছে উৎসবে।

ক্যাপশন ২: বসন্ত উৎসবের জন্য তৈরি করা মঞ্চ। আজ শনিবার সকালে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শিমুলবাগানে

বসন্তবরণে শিমুলবাগান সেজেছে নতুন রূপে। বাগানজুড়ে গাছের ডালে থোকা থোকা ফুল, পাখির কলরব। পাশেই নদীর কলতান। ফুল, পাখি আর বসন্তের হাওয়ায় মন উদাস হয়ে ওঠে। শিমুলবাগানে ফুল ফোটার অপেক্ষায় থাকেন অনেকে। কেউ কেউ অপেক্ষায় থাকেন পয়লা ফাল্গুনের। বাসন্তী সাজে ছুটে আসেন যাদুকাটা নদীর তীরের এই শিমুলবাগানে। কেউ আসেন পরিবার নিয়ে, কারও সঙ্গে থাকে প্রিয় মানুষ। কেউবা আবার একা এসে নিজেকে খোঁজেন প্রকৃতির মধ্যে।

বিশেষ এই দিন ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকেরা আসেন। বাগানে ঘুরে বেড়ান, ছবি তোলেন। তরুণেরা দল বেঁধে গানে মাতেন। শাহ আবদুল করিম, হাছন রাজা, দুর্বিন শাহের গানের সুর ছড়িয়ে পড়ে বাগানজুড়ে। কেউ কেউ গাছের ছায়ায় প্রিয় মানুষের হাত ধরে উদাস হন। কেউ আবার নিরিবিলি বসে সময় কাটান, ঝরে পড়া ফুল কুড়ান। ভালোবাসার গল্পে কাটে তাঁদের সকাল-দুপুর। শুধু বড়রা নন, শিশুরাও আসে শিমুলবাগানে। আনন্দে মাতে তারা। দৌড়াদৌড়ি, ঘোড়ায় চড়া, দোলনায় দোল খাওয়া, পাহাড় দেখা—সবই চলে।

স্থানীয় বাসিন্দা, কবি ও আলোকচিত্রী অমিয় হাসান জানালেন এই বাগান গড়ে ওঠার কথা। ২০০১ সালে এই বাগান গড়ে তোলেন এলাকার একজন বৃক্ষপ্রেমী, সমাজকর্মী প্রয়াত জয়নাল আবেদীন। তাঁর উত্তরসূরিরা এই বাগানের নাম দিয়েছেন ‘জয়নাল শিমুল বাগান’। ৩০ একর জায়গাজুড়ে এই বাগানে রয়েছে প্রায় তিন হাজার গাছ। বলা হয়, এটি দেশের সবচেয়ে বড় শিমুলবাগান। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ফুল ফুটতে থাকে। মাসজুড়েই গাছে ফুল থাকে। এরপর ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে। একসময় গাছে নতুন পাতা গজায়, তখন সবুজ হয়ে ওঠে বাগান।

বাগানে ছড়িয়ে থাকা শিমুল ফুল। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শিমুলবাগানে

প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের ছেলে রাখাব উদ্দিন জানান, বাগানে এ সময় অনেক পর্যটক আসেন। তাঁদের সুবিধার জন্য এখানে ক্যানটিন চালু করা হয়েছে, বিশ্রামের ব্যবস্থাও আছে। উপজেলা প্রশাসন থেকেও এখানে একটি গেস্টহাউস করা হয়েছে। বাগানের সৌন্দর্যবর্ধনসহ তাঁদের আরও কিছু কাজের পরিকল্পনা আছে।