শিক্ষক সুমাইয়া বেগমের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট
শিক্ষক সুমাইয়া বেগমের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট

শান আর জিজ্ঞেস করবে না, ‘ম্যাম, আমি কত পেয়েছি’

‘পরীক্ষা শেষ হলো। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার খাতাও দিল। কিন্তু তখনো আমি জানতাম না, এই খাতাটাই একদিন আমার কাছে শানের শেষ স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে। শান, তোমার প্র্যাকটিক্যালের নম্বর হয়তো আর তোমাকে বলা হলো না। কিন্তু তোমার ম্যামের মনে তোমার যে জায়গাটা তৈরি হয়েছে, সেই জায়গার কোনো নম্বর নেই। কোনো শেষও নেই।’

চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সায়েদ মুনিফ আহমেদ শানকে (১৫) নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এভাবেই লিখেছেন তার শিক্ষক সুমাইয়া বেগম। গত শনিবার নগরের পতেঙ্গা সৈকত এলাকা থেকে শানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। যদিও পরিবার খবর পায় সোমবার সন্ধ্যায়।

গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পোস্টটি দেন সুমাইয়া বেগম। তিনি লিখেছেন, ১০ আগস্ট শান তাঁর কাছে জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষা দিয়েছিল। সে নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, রোল নম্বর ১। পরীক্ষা শেষে খাতাও জমা দিয়েছিল শান। পরদিন ১১ আগস্ট শান (তাঁর কাছে) জানতে চায়, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় সে কত নম্বর পেয়েছে।

‘ম্যাম, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় আমি কত পেয়েছি?’ শানের এ প্রশ্নের কথা উল্লেখ করে সুমাইয়া বেগম লিখেছেন, ‘সাধারণত পরীক্ষা দেওয়ার পর শান নিজের নম্বর জানতে চাইত না।’ শান তাঁকে বলেছিল, ‘ম্যাম, আপনি বলছেন যে এবার আমি বাসায় ভালো করে পড়ছি, পরীক্ষায়ও লিখছি। তাই নম্বরটা জানতে চাইছি। নম্বর জানলে খুশি হতাম!’

সেদিন শানের কথাটি স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল শিক্ষকের কাছে। কিন্তু এখন সে কথাই তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে উল্লেখ করে সুমাইয়া বেগম লিখেছেন, ‘কথাগুলো তখন খুব স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। একজন ছাত্র তার নম্বর জানতে চাইছে, এতে অস্বাভাবিক কী আছে? কিন্তু আজ সেই কথাগুলোই বুকের ভেতর কেমন যেন ছুরির মতো বিঁধে আছে।’

অসুস্থ থাকার কারণে সেদিন শানের ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতা দেখতে পারেননি সুমাইয়া বেগম। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি শানকে নম্বর দিতে পারিনি। ভাবছিলাম...খাতাগুলো দেখব, নম্বর দেব। শানকে বলব, কত পেয়েছে। সেই খাতা এখনো আমার কাছে পড়ে আছে। নম্বর দেওয়া হয়নি। শানও আর এসে জিজ্ঞেস করবে না...“ম্যাম, আমি কত পেয়েছি?”’

শানের বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলে পড়াশোনা করেছে শান। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর থেকে তার রোল নম্বর ১। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও তার আগ্রহ ছিল। শানের জন্য আজ বুধবার বিদ্যালয়ে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিদ্যালয়ের সবাই এতে অংশ নেবেন।

চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল জলিল বলেন, শান খুবই নম্র ও ভদ্র শিক্ষার্থী ছিল। ফুটবল খেলতে খুব পছন্দ করত সে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তার রোল নম্বর ১ ছিল। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল সে। খেলাধুলার প্রতিও তার অনেক ঝোঁক ছিল, বিশেষ করে ফুটবলের প্রতি। শানের মৃত্যুতে বিদ্যালয়ের সবাই মর্মাহত।

বাসা থেকে নিখোঁজ, মুক্তিপণও দেয় পরিবার

শনিবার সকালে স্কুলের কোচিং পরীক্ষায় অংশ নিতে বাসা থেকে বের হয়েছিল শান। পরীক্ষা শেষে চার বন্ধুর সঙ্গে পতেঙ্গা সৈকতে যায় সে। সেখানে সাগরে নামার পর স্রোতের টানে শান ভেসে যায় বলে গতকাল মঙ্গলবার পুলিশকে জানিয়েছে তার সঙ্গে থাকা বন্ধুরা।

সায়েদ মুনিফ আহমেদ শান

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শান নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে অপহরণের কথা বলে পরিবারের কাছে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। শানকে ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবার থেকে টাকা দেওয়াও হয়। তবে পরে জানা যায়, শান আর বেঁচে নেই। এ ঘটনায় শানের বাবার করা মামলায় চার সহপাঠীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শানের চাচা গোফরান উদ্দিন বলেন, শানের মামার বিকাশ নম্বর থেকে টাকা পাঠানো হয়েছে। প্রথমে ষোলশহর স্টেশনে আসতে বলা হয়েছিল। পুলিশ সেখানে গিয়েও কাউকে পায়নি। পরে আরেকটি নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হয়। সেই নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে। পরে জানা গেছে, নম্বরটি লোহাগাড়া এলাকার একজনের নামে। এসব তথ্য পুলিশকে দেওয়া হয়েছে।

হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ সুলতান আহসান উদ্দীন বলেন, শনিবার শান চার বন্ধুর সঙ্গে পতেঙ্গায় ঘুরতে গিয়েছিল। সেখানে সে পানিতে ভেসে যায়। পরে তারা ভয় পেয়ে বিষয়টি কাউকে জানায়নি। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হয়েছে। অপহরণের কথা বলে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। চার কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।