ব্রিটিশ আমলে রূপপুর এলাকাটি ছিল জঙ্গলময়। দিনের আলোতেও মানুষের দেখা মিলত না। রাত হলে শিয়াল ডাকত। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতিকল্পে ১৯১০ সালে ব্রিটিশ সরকার পদ্মা নদীতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু করে। সেই সময়ই পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত হয় দেশের প্রথম রেলওয়ে জংশন স্টেশন, রেলওয়ের কার্যালয়, কোয়ার্টারসহ নানা স্থাপনা। ১৯১৫ সালে একযোগে চালু হয় নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো, যার মাধ্যমে ঈশ্বরদীর নিভৃত গ্রাম রূপপুরে প্রথম উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে।
২০১৩ সালে রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরুর পর থেকে দ্বিতীয় দফা পরিবর্তনের শুরু রূপপুরের। নির্মাণকাজের জন্য রূপপুরে আসতে থাকেন রাশিয়ার নাগরিকেরা। বদলাতে থাকে রূপপুরের রূপ। রাশিয়ানদের বসবাসের জন্য তৈরি করা হয় বড় বড় দালান। একই সঙ্গে গড়ে ওঠে বিপণিবিতান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট, হাসপাতাল ও বিনোদনকেন্দ্র। নিভৃত দিয়ার সাহাপুর ও রূপপুর গ্রাম পরিণত হয় আলোঝলমলে ছোট্ট শহরে।
দিন দিন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে রাশিয়ানদের। এখন তাঁদের দেখলে বোঝাই যায় না দুই দেশ ও দুই ভাষার নাগরিক তাঁরা। দুই দেশ ও দুই ভাষার মানুষ হলেও কেনাবেচায় সমস্যা হচ্ছে না। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা যেমন কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো করে বুঝতে পারছেন রুশ ভাষা, তেমনি বাংলা ভাষা বুঝে নিচ্ছেন রাশিয়ার এসব নাগরিক।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কমিশনিং লাইসেন্স ও উৎপাদনকাজ শুরুর অনুমোদন দিয়েছে। প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানো শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার। বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এটি চূড়ান্ত ধাপ।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল প্রকল্পটি পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা রূপপুর গ্রামে। প্রকল্পের আবাসিক এলাকা গ্রিন সিটি নির্মিত হয়েছে পাশের দিয়াড় সাহাপুর গ্রামে।
পদ্মা নদীতে লালন শাহ সেতু তৈরির পর রূপপুর মোড়টি ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছিল। ছোট-বড় বিভিন্ন দোকানে দখল হয়ে গিয়েছিল মূল সড়ক। মোড়টিতে মাঝেমধ্যে ঘটত দুর্ঘটনা। বর্তমানে পরিচ্ছন্ন হয়েছে মোড়টি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে কোনো দোকানপাট নেই। বসেছে ট্রাফিক পুলিশ বক্স। ফলে দুর্ঘটনা কমে গেছে।
অন্যদিকে আরও পরিবর্তন হয়েছে দিয়ার সাহাপুর। একসময় জায়গাটিতে ছিল অনেক ধানের চাতাল। বড় বড় ট্রাক ও ধুলাবালুতে পূর্ণ থাকত পুরো এলাকা। বর্তমানে তৈরি হয়েছে বড় বড় ভবন, শপিং মল, সুপার মল, বার, রেস্তোরাঁসহ নানা স্থাপনা। উন্নয়নের এই ছোঁয়া লেগেছে ঈশ্বরদী উপজেলা সদর ও পাবনা জেলা সদরে। রাশিয়ানদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ঈশ্বরদীতে নতুন করে ৪টি রিসোর্ট, প্রায় ১০টি রেস্তোরাঁ, ১৫টি বেসরকারি হাসপাতাল, ৫টি মল তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জেলা সদরে একটি হাসপাতাল, দুটি রিসোর্ট ও নতুন করে অন্তত পাঁচটি রেস্তোরাঁ তৈরি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
জেলা শহরের জালালপুর গ্রামে ইউনিভার্সাল গ্রুপ তৈরি করেছে রত্নদীপ নামে একটি রিসোর্ট। ইউনিভার্সাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানী হোসেন বলেন, ‘বিদেশি নাগরিকদের সুবিধা বিবেচনা করেই তাঁরা রিসোর্টটি করেছেন। রাশিয়ান, ইন্ডিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা রিসোর্টে আসছেন। তাঁরা এখানে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিলেমিশে সুইমিং করেন, খাওয়াদাওয়া করেন। তাঁরা খুব শান্ত, সবাইকে সম্মান করেন।’
পাবনা জেলা শহর থেকে পাবনা-রূপপুর আঞ্চলিক সড়ক ধরে এগোলে রূপপুর মোড়। এ মোড়ের কোনাতেই পদ্মা নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সেখানে চলছে মহাকর্মযজ্ঞ। কেন্দ্রের সামনের ফাঁকা মাঠে সাইকেল, মোটরসাইকেল রেখে শত শত কর্মী প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করছেন। কেউবা বের হচ্ছেন। সিসি ক্যামেরা আর ওয়াচ টাওয়ার দিয়ে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা চারপাশ। সব দিক থেকেই চারপাশে নজর রাখছেন নিরাপত্তাকর্মীরা।
রূপপুর মোড়ে রিকশা নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষা করছিলেন মমিন উদ্দিন (৬০)। তিনি বলেন, ‘আমাগের চোখেই তো কত কিছু দেখলেম। আগে কী ছিল আর এহন কী হলো। শুনলেম কয়দিন পর ইডা (প্রকল্প) চালু হবি। কেউ কেউ ভয় দেহায়, কেউ কয় ভালো হবি। আমরা ভালোডাই চাই।’
রূপপুর মোড় থেকে ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া মোড়ের দিকে কিছু দূর এগোলেই বাঁয়ে চরসাহাপুর, ডানে দিয়াড় সাহাপুর। দুই পাশে তাকালে চোখে পড়ে বদলের চিত্র। ডান দিকে লিচুবাগান আর গ্রামীণ কাঁচাপাকা বাড়ি। দিয়াড় সাহাপুরে তৈরি হয়েছে প্রকল্পের আবাসিক এলাকা গ্রিন সিটি। সিটির সামনে ‘নতুন হাট’ নামে ছোট একটি বাজার। শাকসবজি, ফল, মাছ-মাংস নিয়ে বাজারে বসেছেন ক্রেতারা। রাশিয়ানরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাজারে। মনে হয়, রাশিয়ার কোনো শহরে বাঙালিরা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। বাজারটির চারপাশে সেলুন, রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, ক্যাফে, ক্লাবসহ আধুনিক সব দোকান। রাশিয়ান ভাষায় নাম দেওয়া হয়েছে এসব দোকানের।
গ্রিন সিটির সামনে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল সরদারের সঙ্গে। তিনি জানান, নতুন হাট আগে রবি ও বুধবার বসত। স্থানীয় লোকজন কেনাকাটা করতেন। রাশিয়ানরা আশার পর বাজারের পরিধি বেড়েছে। এখন প্রতিদিনই বাজার বসছে। নতুন করে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
বাজারে নাকে শুঁকে বেল দেখছিলেন এক রাশিয়ান। তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলেন দোকানি মহিদুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাশিয়ানরা মাছ–মাংসের চেয়ে ফল ও সবজি বেশি খান। বাংলাদেশের ফল পছন্দ করেন। বেল–তরমুজ সবই কেনেন। বেলের যে গন্ধ আছে, সেটাও জেনে গেছেন। তাই গন্ধ শুঁকে বেল বাছাই করছেন।
একসঙ্গে থাকতে থাকতে সাহাপুর-রূপপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে রুশ-বাংলাদেশিদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। রাশিয়ানরা যেমন শিখেছেন দু–চারটি বাংলা কথা, তেমনি বাংলাদেশিরা শিখেছেন রাশিয়ান ভাষা। ফলে ভাব বিনিময়ে নতুন এক মাত্রা যোগ হয়েছে।
সাহাপুরের নতুন হাটের প্রবেশমুখের মুদিদোকানদার আমজাদ হোসেন (৬০)। অক্ষরজ্ঞান নেই তাঁর। তবে সহজেই রাশিয়ানদের কাছে পণ্য বিক্রি করছেন তিনি। আমজাদ হোসেন জানান, প্রথম প্রথম খুব সমস্যা হতো। রাশিয়ানদের কথা কিছুই বুঝতে পারতেন না। দিনে দিনে এখন বুঝে গেছেন। ওরা ইশারা করে পণ্য দেখায়। এক কেজি নিলে বলে, এক কিলো। আর ডিমের বেলায়, ৩০টা নিলে বলে থ্রি-জিরো। দোকানিরা ক্যালকুলেটরে তাঁদের দাম দেখান। এতেই মিলেমিশে বেচাকেনা হয়।
হাটের সবজি বিক্রেতা আমির হোসেন বলেন, ‘রাশিয়ানরা এহন আমাগের সাথে মিশে গেছে। আমরা আগে উগের বন্ধু কয়ে ডাকতেম। উরা তো বন্ধু কবের পারে না, বন্দু বন্দু কয়া আমাগের ডাকে। ভালোই লাগে।’
শুধু নতুন হাটই নয়, রাশিয়ানরা ঈশ্বরদী উপজেলা ও জেলার বিভিন্ন হাটবাজার, বিপণিবিতানে ঘুরে বেড়ান। সবখানেই চোখে পড়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গে তাঁদের কথোপকথনের দৃশ্য।
ঈশ্বরদী উপজেলা সদরের রেলগেট এলাকা থেকে রিয়াদ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী জানান, রাশিয়ানরা বাংলাদেশিদের খুব আপন করে নিয়েছে। গত রমজানের ঈদে কয়েকজন রাশিয়ান ঈশ্বরদীর বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে ঘুরে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কেনাকাটা করতে আসা সবার হাতে একটি করে গোলাপ ফুল তুলে দিয়েছেন। বিষয়টি সবাইকে বেশ অভিভূত করেছে।
প্রকল্পের সাইট ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের ভেতরে ও বাইরে সবখানেই রুশদের আচরণ বেশ আন্তরিক। তাঁরা খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারেন। ভাষার একটু সমস্যা হলেও তাল মিলিয়ে নেন।
২০১৩ সালের ২ অক্টোবর বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী চলতে থাকে বিশাল কর্মযজ্ঞ। দেশি-বিদেশি প্রায় ৩০ হাজার কর্মী রাত–দিন কাজ করতে থাকেন। প্রায় ১৩ বছর এই কর্মযজ্ঞের সমাপ্তি হতে চলেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে প্রকল্প। এতে খুশি প্রকল্পে কর্মরত কর্মীরা।
প্রকল্পের সাইট অফিস সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চলায় বহু কর্মী পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২৩ হাজার দেশি কর্মী ও প্রায় ৬ হাজার বিদেশি কর্মী প্রকল্পে কাজ করছেন। রাত–দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ চলছে।
রূপপুর মোড়ে কথা হয় প্রকল্পের কর্মী রিয়াজ হোসেনের সঙ্গে। তিনি কুষ্টিয়া থেকে কাজ করতে আসেন। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রকল্পে কাজ করছেন। কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি। প্রকল্পের ভেতরে ঢুকলেই সব গোলকধাঁধার মতো লাগে। মনে হয় এ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
ঈশ্বরদীর বাঁশেরবাদা গ্রামের শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কাজ শেষ হলি হয়তো চাকরি থাকপিনানে, তয় হেনে কয় বছর কাজ করলেম, বড় ইতিহাসের সাক্ষী হলেম, ইডাই শান্তি।’
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে দুটি ইউনিটে ভিভিইআর রিঅ্যাক্টর থাকবে। প্রতি ইউনিটে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। ২ ইউনিট মিলে মোট উৎপাদন হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। পুরো প্রকল্পটি শেষ হলে এই এলাকার চিত্র আরও বদলে যাবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট লোকজন। পুরো রূপপুর ও সাহাপুর হবে নতুন আধুনিক শহর।
প্রকল্পের সাইট ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস জানান, কয়েক বছর আগেও দিয়াড় সাহাপুর গ্রামে কোনো উঁচু ভবন ছিল না। এখন ১৭টি দৃষ্টিনন্দন ২০ তলা ভবন হয়েছে। আরও কয়েকটি ভবন হবে। বেসরকারিভাবে অনেক স্থাপনা হচ্ছে। প্রকল্পটি চালু হলে এলাকাটি আধুনিক শহরে পরিণত হবে।