হামের লক্ষণ নিয়ে দুই দিনের ব্যবধানে মারা গেছে দুই যমজ মেয়ে। শোকে পাগলপ্রায় তাদের মা মরিয়ম বেগম। গত শনিবার কক্সবাজার সদর হাসপাতালে
হামের লক্ষণ নিয়ে দুই দিনের ব্যবধানে মারা গেছে দুই যমজ মেয়ে। শোকে পাগলপ্রায় তাদের মা  মরিয়ম বেগম। গত শনিবার কক্সবাজার সদর হাসপাতালে

‘একসঙ্গে পৃথিবীতে এসেছিল দুই বোন, দুই দিনের ব্যবধানে চলে গেল দুজনই’

সাত মাস বয়সের যমজ বোন রৌশনি ও রাবেয়া। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে গত সপ্তাহে হামের লক্ষণ নিয়ে দুই দিনের ব্যবধানে মারা যায় তারা। শুরুতে দুই বোন সাধারণ সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল। জ্বর না কমায় দুজনকে নেওয়া হয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখান থেকে সদর হাসপাতালে আনা হলে হামের লক্ষণ ধরা পড়ে। যমজ দুই বোনসহ হামের লক্ষণ নিয়ে কক্সবাজারে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুই সন্তান হারিয়ে রৌশনি ও রাবেয়ার বাবা-মা পাগলপ্রায়। তারা এখনো বুঝতে পারছেন না, কী থেকে কী হয়ে গেল।

কক্সবাজারের রামু উপজেলার মিঠাছড়ি ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা দক্ষিণ মিঠাছড়ি গ্রামে কৃষক আজিজুল হকের টিনের বাড়ি। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর দুই ঘণ্টার ব্যবধানে এই ঘরে জন্ম নেয় ফুটফুটে যমজ মেয়েশিশু রৌশনি ও রাবেয়া। সন্তানদের মুখ দেখে আনন্দে ভাসে পরিবার। কিন্তু ঈদের কয়েক দিন হঠাৎ আগে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হয় দুই মেয়ে। এরপর চিকিৎসার জন্য তাদের ভর্তি করা হয় শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে।

স্বাস্থ্যের অবনতি হলে গত ২২ মার্চ সকালে আনা হয় ২৫০ শয্যার সরকারি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। পরীক্ষার পর দুই শিশুর হামের উপসর্গ ধরা পড়ে। ওই দিন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের হাম ইউনিটের ২৭ নম্বর শয্যায় আরও দুই শিশুর সঙ্গে ভর্তি করা হয় রৌশনি ও রাবেয়াকে। ১৩ দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় রৌশনি। তার দুই দিন পর গত শনিবার সকালে মারা যায় রাবেয়া।

যমজ দুই মেয়েকে হারিয়ে দিশাহারা মা মরিয়ম বেগম ও আজিজুল হক। গত শনিবার বিকেলে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মা মরিয়ম বেগম (৪০) বিলাপের সুরে বলেন, ‘জ্বর আঁর দুই মাইয়ারে শেষ গরি ফেলাইয়ে। আরতুন কাড়ি লই গিয়ে।’

মরিয়ম ও তাঁর স্বামী আজিজুলের সংসারে দুই ছেলে-মেয়ের পর একসঙ্গে দুই মেয়ে ঘর আলো করে আসে। আনন্দে ভাসছিল পুরো পরিবার। আজিজুল বলেন, ‘জন্মের পর যমজ দুই মেয়ের চেহারা দেখে খুশি হয়েছিলাম। স্বাস্থ্যও ভালো ছিল তাদের। কিন্তু হঠাৎ জ্বর দুই মেয়েকে কেড়ে নিল। একসঙ্গে পৃথিবীতে এসেছিল ওরা। আবার দুই দিনের ব্যবধানে একসঙ্গে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’

মরিয়ম ও তাঁর স্বামী আজিজুলের সংসারে দুই ছেলে-মেয়ের পর একসঙ্গে দুই মেয়ে ঘর আলো করে আসে। আনন্দে ভাসছিল পুরো পরিবার। আজিজুল বলেন, ‘জন্মের পর যমজ দুই মেয়ের চেহারা দেখে খুশি হয়েছিলাম। স্বাস্থ্যও ভালো ছিল তাদের। কিন্তু হঠাৎ জ্বর দুই মেয়েকে কেড়ে নিল। একসঙ্গে পৃথিবীতে এসেছিল ওরা। আবার দুই দিনের ব্যবধানে একসঙ্গে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’

দুই মেয়েকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও পারেননি বলে আক্ষেপ রয়েছে গেছে বাবা আজিজুল হকের। তিনি বলেন, ‘দুই মেয়েকে বাঁচাতে হাসপাতালে হাসপাতালে ছুটলাম। শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে দুই মেয়ের কয়েক দিন চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে সদর হাসপাতালে আনা হয়। সেখানে হামের উপসর্গ ধরা পড়ে। দুই মেয়েকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। আমার মামণিদের বাঁচানো গেল না।’

আজিজুল হক বলেন, দুই ঘণ্টার ব্যবধানে প্রথমে রৌশনি এবং পরে রাবেয়ার জন্ম হয়েছিল। যমজ মেয়ে জন্মের পর ঘরে আনন্দের বন্যা বইছিল। সাত মাসের ব্যবধানে সেই আলো নিভে গেল। কান্নায় ভেঙে পড়ে আজিজুল বলেন, সবই আল্লাহর ইচ্ছা।

হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের ইনচার্জ ও সহকারী রেজিস্ট্রার শহিদুল আলম বলেন, যমজ দুই শিশুসহ এ পর্যন্ত এই ইউনিটে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সবার বাড়ি মহেশখালী ও রামুতে। হাম উপসর্গের পাশাপাশি মারা যাওয়া শিশুরা নিউমোনিয়া- ডায়রিয়াতেও আক্রান্ত ছিল।

এভাবে আরও দুই শিশুর সঙ্গে একই শয্যায় রেখে যমজ দুই বোনের চিকিৎসা চলেছিল। কিন্তু বাঁচানো যায়নি তাদের

হামের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর গতকাল রোববার বেলা ১১টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামুতে শিশুদের হাম-রুবেলা প্রতিরোধে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারের দ্বীপাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় হামের উপসর্গ বেশি দেখা দিচ্ছে। এসব এলাকার কোনো শিশু যেন টিকা থেকে বাদ না পড়ে, সেদিকে নজর দিতে হবে।

কক্সবাজার সদর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে অনেকটা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দক্ষিণ মিঠাছড়ি গ্রাম। গ্রামের এক প্রান্তে কৃষক আজিজুল হকের বাড়ি। ঈদের আগ থেকে দুই মেয়ের অসুস্থতার জন্য সব কাজকর্ম থেকে দূরে তিনি। বাড়ির উঠানে বসে চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘কী থেকে কী হয়ে গেল, বলতে পারব না। আমার মামণিরা আর নেই।’