
‘গোঠের রাখাল, বলে দে রে কোথায় বৃন্দাবন’—পেছনে রাখাল, সামনে ধুলা উড়িয়ে ঘরমুখী গরুর পাল দেখে কাজী নজরুল ইসলামের গানের এই পঙ্ক্তি মনে পড়ে। পেছনে বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর সামনে গ্রামের মায়া। রাখাল গরুর পাল নিয়ে তখন ঘরে ফিরছে। শুধু রাখাল নয়, কৃষক, মৎস্যজীবীসহ নানা পেশার মানুষ তখন হাওর থেকে বাড়ির দিকে ফিরছেন।
মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত কাউয়াদীঘি হাওরে তখন বিকেলটা রঙিন হয়ে উঠেছে। সবুজ ধানখেতে ছিটেফোঁটা সাদা রং—যেন কেউ ছবি এঁকেছে। এই রং বক পাখিদের। কোথাও চিলের দল শুকনা বিল থেকে মরা মাছ কুড়িয়ে নিতে আকাশে পাক খেয়ে উড়ছে। কোথাও খুঁটিতে বাঁধা গরু ঘাস খাচ্ছে। কোথাও যন্ত্রে চলছে বোরোখেতে সেচ দেওয়া। কেউ সারা দিন হাওরে মাছ ধরে বাড়ি ফিরছেন। কাউয়াদীঘি হাওরের বিকেলটা এমন বিচিত্র আয়োজন ও বৈচিত্র্যে আলাদা এক জগৎ।
২৪ জানুয়ারি বিকেলে সদর উপজেলার বিরইমাবাদ এলাকা দিয়ে হাওরের দিকে ঢুকতেই চোখের সামনে বিশাল প্রান্তর খুলে যায়। যেদিকে দৃষ্টি যায়, সেদিকেই সবুজ হয়ে উঠেছে হাওরের বুক। এখন শুষ্ক মৌসুম। হাওরে পানির দেখা নেই। বিলের মধ্যে পানি আটকে আছে। দূর থেকে সেই পানি দেখা যায় না, সবুজই চোখে পড়ে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে চলছে বেলা। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু মানুষের ব্যস্ততা শুধু চোখে পড়ে। কেউ মাথায় করে, কেউ কাঁধে ভরে, কেউ ঠেলাগাড়ি বোঝাই করে গবাদিপশুর জন্য হাওর থেকে ঘাস নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তাঁরা হয়তো সকাল বা দুপুরের দিকে ঘাস তুলতে হাওরে গিয়েছিলেন। একটু পরপর একেকটি গরুর পাল ধুলা উড়িয়ে হাওরের পথ ধরে বাড়ির দিকে ফিরছে। সঙ্গে ক্লান্ত রাখাল হাঁটছে। হাওর থেকে অনেক দূরে দূরে একেকটি গ্রাম। এই দূরত্বে সবাই অভ্যস্ত বলে প্রতিদিনই আসা-যাওয়ায় দিন কেটে যায়।
বিরইমাবাদ এলাকার মোখতার মিয়া জানালেন, সকাল আটটার দিকে গরুগুলো নিয়ে হাওরের বুকে চলে আসে রাখালের দল। ফিরে বিকেলে বা সন্ধ্যায়। বিকেল চারটা-পাঁচটা থেকে ফেরা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত গরুর পাল নিয়ে বাড়ি ফেরা চলে।
একজন একটি মহিষ ও তার শাবককে নিয়ে ফিরছেন ঘরে। হাওরের বুকে ধানখেতগুলো তখন সবুজে চকচক করছে। কোথাও কাকতাড়ুয়া। দূর থেকে মনে হয় খেতের মধ্যে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। একেকটি খেতে অনেক সাদা বক বসে আছে। কোথাও খেতের মধ্যে পাখিরা লাফিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে, উড়ছে-বসছে। কোথাও এক খেত থেকে অন্য খেতে ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাচ্ছে। হাওরের যেদিকে চোখ যায়, এ রকমই সাদা রঙের মেলা তখন।
একটা চিল বসে আছে খুঁটিতে। হয়তো উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে গেছে। বেশ কিছু চিল উড়ছে, ঘুরছে। পাশেই একটি বিলের ওপরে অনেক চিল ওড়াউড়ি করছে, হঠাৎ নিচে নেমে মাছ ধরছে। এই বিলটি সেচে মাছ ধরা হয়েছে। তাতে এখন মৃত, অর্ধমৃত মাছ ভেসে উঠছে। সেসব ধরতেই পাখিদের এই ওড়াউড়ি, চঞ্চলতা। এই বিলের পাশে ‘উরা’ (তাঁবুর মতো অস্থায়ী ঘর) তৈরি করে আছেন একদল মানুষ। তাঁরা বিল থেকে মাছ ধরেন। হাওর থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর তাঁরা এখানে উরা তৈরি করে আছেন।
হাওরের ভেড়াবিল এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান জানালেন, তাঁরা কয়েকজন মিলে এখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন ৮-১০টি ছোট ছোট বিল ইজারা নিয়েছেন। এখন বিল থেকে মাছ ধরছেন। এসব বিলে রুই, শোল, কই, মাগুর, পুঁটিসহ ছোট মাছ পাওয়া যায়। আশ্বিন-কার্তিক থেকে বিল পাহারার কাজ চলে তাঁদের, চলবে এই মাঘ মাস পর্যন্ত। এখন মাছ ধরা প্রায় শেষ পর্যায়ে।
পথে আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁরা কেউ বিলের মাছ কিনে শহরের দিকে ছুটছেন। কেউ মাছ ধরেছেন নিজেরাই। কিছু বিক্রি করেছেন, কিছু নিজেদের খাওয়ার জন্য বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। দুজনকে পাওয়া গেল, তাঁরা সারা দিন হাওরের খালে বড়শি দিয়ে ট্যাংরা ও গুলশা মাছ ধরেছেন। মাছগুলো তখনো ব্যাগের মধ্যে লাফাচ্ছে।
কোথাও যন্ত্র দিয়ে খাল থেকে বোরোখেতে পানি দেওয়া হচ্ছে। কেউ সারা দিন খেত পরিচর্যা শেষে ‘সেউতি’ (পানি সেচার হাতে তৈরি যন্ত্র) কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। হাওরের পথে তখন মানুষের বাড়ি ফেরাটাই চোখে পড়ে। দিনের ক্লান্তি শেষে এক টুকরো আশ্রয়ের কাছে তাঁদের এই ফেরা। দিনটা ফুরিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে সূর্যের আলো মৃদু হয়ে সন্ধ্যাকে ডাকছে, রাতকে ডাকছে। হাওরপারের মানুষ বহুকাল ধরে প্রকৃতির এই আয়োজনে জীবন কাটিয়ে চলেছেন।