খননযন্ত্রের সাহায্যে এভাবে পাহাড় কেটে সমান করে সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। গত শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে
খননযন্ত্রের সাহায্যে এভাবে পাহাড় কেটে সমান করে সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। গত শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে

ভবন তৈরির জন্য পাহাড় কাটা হচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে

সবুজ পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাসের জন্য খ্যাতি রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের। এটিই এ ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ। এবার সেই পাহাড়েই পড়েছে কোদালের কোপ। পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন না মেনে ভবন নির্মাণের জন্য একটি পাহাড় কাটছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে প্রায় ২ শতাংশ জায়গার পাহাড় কেটে সমতল করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরের পাশেই পাহাড় কাটা হচ্ছে। সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো ধরনের পাহাড় কাটতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আগে অনুমতি নিতে হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ অনুমতি নেয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও নিরাপত্তা দপ্তরের মাঝামাঝি জায়গায় পরিবহন দপ্তরের অবস্থান। গত শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, দপ্তরের বাইরে মূল ফটক আটকানো। বাইরে থেকে ভেতরে কী হচ্ছে, তা বোঝার উপায় নেই। ফটকের কাছে গিয়ে উঁকি দিতেই দেখা গেল ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। পাশে রাখা একটি খননযন্ত্র (এক্সক্যাভেটর)। এ ছাড়া ভবন নির্মাণসামগ্রী ও চার থেকে পাঁচটি গাছ পড়ে রয়েছে। খালি চোখে দেখা যায় ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার পাহাড়ের একটি অংশ এখন সমতল।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১ এপ্রিল দপ্তরের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স’ ভবনটি নির্মাণ করছে। প্রথম ধাপে প্রায় ১১ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে ভবনের একটি অংশ নির্মাণ করা হবে। এ ধাপের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে প্রায় ২২ হাজার বর্গফুট এলাকায় তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হবে।

গাছ ও পাহাড় কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ প্রথম আলোকে বলেন, কতটি গাছ কাটা হয়েছে বা কী পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়েছে, তা এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত পাহাড়ের ঢালে ভেঙে পড়া অংশেই কাজ হয়েছে।

দপ্তরের বাইরে মূল ফটক আটকানো। বাইরে থেকে ভেতরে কী হচ্ছে, তা বোঝার উপায় নেই। ফটকের কাছে গিয়ে উঁকি দিতেই দেখা গেল ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। পাশে রাখা একটি খননযন্ত্র (এক্সক্যাভেটর)। এ ছাড়া ভবন নির্মাণসামগ্রী ও চার থেকে পাঁচটি গাছ পড়ে রয়েছে। খালি চোখে দেখা যায় ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার পাহাড়ের একটি অংশ এখন সমতল।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত) অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া পাহাড় অথবা টিলা কাটা নিষিদ্ধ। তবে জাতীয় স্বার্থে বিশেষ ক্ষেত্রে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় কাটার সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, দেশের যেকোনো স্থানে পাহাড় কাটতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণের বিষয়টি এক চিঠিতে জানিয়েছিল। তবে এতে ভবনের আয়তন পাঁচ হাজার বর্গমিটারের কম উল্লেখ করা হয়েছে। এত কম আয়তনের ভবনের পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়টি অধিদপ্তরের এখতিয়ারে পড়ে না। এ চিঠিতে পাহাড় কাটার কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। যদি পাহাড় কাটার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ ও পাহাড় কাটা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করে ‘আওয়ার গ্রিন ক্যাম্পাস’ নামের একটি সংগঠন। জানতে চাইলে সংগঠনের সভাপতি মো. মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, ভবন নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পরিবেশের ন্যূনতম ক্ষতি না করে বিকল্প জায়গায় ভবন নির্মাণ করা যেত।

চলতি বছরের ১ এপ্রিল দপ্তরের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স’ ভবনটি নির্মাণ করছে। প্রথম ধাপে প্রায় ১১ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে ভবনের একটি অংশ নির্মাণ করা হবে। এ ধাপের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে প্রায় ২২ হাজার বর্গফুট এলাকায় তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সমাজসেবা ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক তাহসিনা রহমান বলেন, প্রশাসন শিক্ষার্থীদের মতামত ও পরিবেশগত বিষয় উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিবহন দপ্তরের নতুন ভবন নির্মাণ সম্পর্কেও তাঁদের আগে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তবে ভবন তৈরিতে পাহাড় কাটার কথা অস্বীকার করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান। তাঁর দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় কোনোভাবেই পাহাড় কাটছে না। সামান্য অংশ সমান করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। তবে আমরা খুব বেশি ক্ষতি করছি না। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রক্রিয়ায় গেলে অনেক ঝামেলা হয়, তাই বিষয়টি আমরা নিজেরাই সতর্কতার সঙ্গে দেখছি।’

নতুন স্থাপনায় পাহাড়কে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক কামাল হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাহাড়কে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেই সমস্যা। চট্টগ্রামের পাহাড়ের মাটি এমনিতেই খুব স্থিতিশীল নয়। একবার কাটাছেঁড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে ঝুঁকি তৈরি হয়। যদি উন্নয়নকাজ করতেই হয়, তাহলে যতটা সম্ভব পাহাড় এড়িয়ে বা প্রাকৃতিক ঢালের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা উচিত।’

অধ্যাপক কামাল হোসাইন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়নকাজ অবশ্যই হবে। তবে নতুন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত, যাতে পাহাড় ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি সর্বনিম্ন হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের এমন উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, যেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পাহাড়কে যতটা সম্ভব কম স্পর্শ করা হয়।’