দীর্ঘ ৩৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিন ময়মনসিংহের ত্রিশালের দেওয়ানীয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জোৎস্না আরা বেগমকে ঘোড়ার গাড়িতে বিদায় জানানো হয়। গতকাল বৃহস্পতিবারের ছবি
দীর্ঘ ৩৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিন ময়মনসিংহের ত্রিশালের দেওয়ানীয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জোৎস্না আরা বেগমকে ঘোড়ার গাড়িতে বিদায় জানানো হয়। গতকাল বৃহস্পতিবারের ছবি

৩৯ বছরের শিক্ষকতা–জীবনের শেষ দিন ‘জোৎস্না আপাকে’ ঘোড়ার গাড়িতে বিদায়

সাজানো ঘোড়ার গাড়ির চারপাশে শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর ভিড়। বিদায়ের মুহূর্তটি যেন উৎসবে পরিণত হয়েছিল। ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিদ্যালয় ছাড়লেন শিক্ষক জোৎস্না আরা বেগম। দীর্ঘ ৩৯ বছরের শিক্ষকতা–জীবনের শেষ দিনে তাঁকে জানানো হয় এমনই রাজকীয় বিদায়।

ময়মনসিংহের ত্রিশালের দেওয়ানীয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে অবসরে গেছেন জোৎস্না আরা বেগম। এলাকায় তিনি ‘জোৎস্না আপা’ নামে পরিচিত।

বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী মো. সেলিম ফরাজী বলেন, ‘জোৎস্না আপা অত্যন্ত ভদ্র ও কোমল হৃদয়ের মানুষ। দীর্ঘ ৩৯ বছর তিনি আমাদের নিজের সন্তানের মতো স্নেহ ও শাসন দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর আদর্শ ও মূল্যবোধ আমাদের জীবন চলার পথে চিরদিন প্রেরণা হয়ে থাকবে।’

শিক্ষক জোৎস্না আরা বেগমের বিদায়ের দিনে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়

১৯৮৭ সালে ত্রিশাল উপজেলার বইলর ইউনিয়নের দেওয়ানীয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন জোৎস্না আরা বেগম। দীর্ঘ শিক্ষকতা–জীবনে তিনি একাধিক প্রজন্মের শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন। তাঁর বিদায় উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, এলাকার মুরব্বি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।

জোৎস্না আরাকে এমন বিদায় দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীরাও। সহকারী শিক্ষক লক্ষ্মী রানী বলেন, ‘জোৎস্না আরা ম্যাডামের বিদায় আমাদের জন্য কষ্টের। তবে আজকের আয়োজন দেখে আমরা গর্বিত। তিনি শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন না, পুরো এলাকার মানুষের সঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। এলাকাবাসী তাঁকে কতটা ভালোবাসেন, আজকের আয়োজনেই তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।’

সহকর্মী, এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সব সময় ভালোবাসা ও সহযোগিতা পেয়েছি। আজকের অনুষ্ঠানে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকার মুরব্বিসহ সবাই যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটি আমার শিক্ষকতা–জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।
জোৎস্না আরা বেগম, অবসরে যাওয়া শিক্ষক

দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে এমন বিদায় বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন জোৎস্না আরা। তিনি বলেন, ‘বিদায়ের সময় মন খারাপ হয়েছিল। তবে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সামনে দেখে আবার উজ্জীবিত হয়েছি। আমার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে শিক্ষককে সম্মান জানাতে এসেছে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। বর্তমান শিক্ষার্থীরাও ভালো করছে। শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি ও মানুষের ভালোবাসা নিয়ে শিক্ষকতা–জীবন শেষ করতে পারছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।’

সমাজসেবক আবদুল আলীমের সভাপতিত্বে ও মফিজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবক মনিরুজ্জামান সোমেল, ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মনিরুজ্জামান মিলন, সাবেক শিক্ষক মজিবুর রহমান, প্রধান শিক্ষক আয়েশা মোস্তারি, সহকারী শিক্ষক তাসলিমা বেগমসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

কর্মজীবনের শেষ দিন ঘোড়ার গাড়িতে করে শিক্ষক জোৎস্না আরাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়

জোৎস্না আরা অত্যন্ত আন্তরিক ও ইতিবাচক মানুষ উল্লেখ করে লক্ষ্মী রানী আরও বলেন, ‘তিনি সহকর্মীদের সহযোগিতা করার পাশাপাশি এলাকার মানুষের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা করতেন। প্রত্যেক শিক্ষকেরই প্রত্যাশা থাকে, তাঁর বিদায় যেন ভালোবাসা ও সম্মানের মধ্য দিয়ে হয়। জোৎস্না ম্যাডামের বিদায়টি তেমনই হয়েছে।’

বিদায় অনুষ্ঠান শেষে ফুল দিয়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে জোৎস্না আরা বেগমকে তুলে দেওয়া হয়। প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর ভালোবাসা ও আনন্দাশ্রু নিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ছাড়েন তিনি। ঘোড়ার গাড়িতে তাঁর এই বিদায় হয়ে ওঠে দীর্ঘ ৩৯ বছরের শিক্ষকতা–জীবনের স্মরণীয় সমাপ্তি।

শিক্ষকতা–জীবনের পুরো সময় আনন্দের ছিল জানিয়ে বিদায় অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত জোৎস্না আরা বলেন, ‘সহকর্মী, এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সব সময় ভালোবাসা ও সহযোগিতা পেয়েছি। আজকের অনুষ্ঠানে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকার মুরব্বিসহ সবাই যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটি আমার শিক্ষকতা–জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।’

বিদায়ী শিক্ষকের সম্মানার্থে মানপত্র পাঠ করেন সহকারী শিক্ষক নূরে গুলশান।
অনুষ্ঠানে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৯৮৪ ব্যাচের সুজন, ১৯৯৩ ব্যাচের ওসমান গনি ও মামুন মিয়া ও ১৯৯৬ ব্যাচের মো. সেলিম ফরাজী, আসাদুজ্জামান আসাদ, মুফতি মাওলানা সোহাইল মিয়াসহ বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন। তাঁরা প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে কাটানো বিভিন্ন স্মৃতি স্মরণ করেন।