ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে নবজাতকের জন্মের পর তরুণেরা দুটি করে গাছের চারা উপহার দিয়ে বাড়ির আঙিনায় রোপণ করে দেন। সম্প্রতি তোলা
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে নবজাতকের জন্মের পর তরুণেরা দুটি করে গাছের চারা উপহার দিয়ে বাড়ির আঙিনায় রোপণ করে দেন। সম্প্রতি তোলা

তরুণদের অন্য রকম উদ্যোগ, নবজাতকের জন্মের পর লাগানো হয় দুটি করে গাছ

কোনো পরিবারে শিশু জন্মের খবর পেলেই উপহার নিয়ে ছুটে যান একদল তরুণ। তাঁদের হাতে থাকে একটি ফলদ ও একটি বনজ গাছের চারা। নবজাতকের নামে বাড়ির আঙিনায় নিজেরাই গাছ দুটি রোপণ করে দেন তাঁরা। ‘একটি শিশু দুটি বৃক্ষ, লাগাব বৃক্ষ তাড়াব দুঃখ’ স্লোগানে ব্যতিক্রমী এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনতার ঈশ্বরগঞ্জ। ইতিমধ্যে সংগঠনটির সদস্যরা এক হাজারের বেশি শিশুর নামে গাছ লাগিয়েছেন।

ঈশ্বরগঞ্জের একদল স্বপ্নবাজ তরুণ ফেসবুকভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘জনতার ঈশ্বরগঞ্জ’ থেকে একত্র হয়ে ২০২১ সাল থেকে সামাজিক ও মানবিক কাজ করে আসছেন। শতাধিক তরুণ যুক্ত আছেন সংগঠনটির সঙ্গে। ২০২৩ সালে তাঁরা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করেন। তবে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নবজাতকের জন্ম উপলক্ষে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেন তাঁরা।

সংগঠনের তথ্যমতে, গত ১১ মে পর্যন্ত ১ হাজার ১১ জন শিশুর নামে ২ হাজার ২২টি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। শুধু নবজাতক নয়, কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে তাঁর স্মরণেও দুটি করে গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সংগঠনটি। আজ ১ জুন সংগঠনের পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নতুন এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।

বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি অসহায় মানুষের আর্থিক সহায়তা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, ইফতার ও ঈদসামগ্রী বিতরণ, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সহায়তা এবং রক্তদান কর্মসূচিও পরিচালনা করে সংগঠনটি।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এহসানুল হক বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে নির্বিচার গাছ কাটা হচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে মানুষের স্বাস্থ্য ও জলবায়ু হুমকির মুখে পড়ছে। প্রতিটি প্রাণীই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বৃক্ষ বা উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, অক্সিজেনের ঘাটতি দূর করা ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতেই গাছ লাগানোর এ উদ্যোগ শুরু করেছি আমরা।’

এহসানুল হক আরও বলেন, ‘২০২৩ সালে আমাদের সংগঠনের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিই, নবজাতকের বাড়িতে দুটি করে বৃক্ষ লাগাব। শিশু বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গাছও বেড়ে উঠবে। এই গাছে জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে এবং ফলদ গাছ থেকে ফল এবং বনজ গাছ বিক্রি করে শিশুর পরিবার অর্থ পাবে। আমরা চাই আমাদের এই উদ্যোগ দেখে অন্যরা উৎসাহী হয়ে বৃক্ষরোপণে উদ্যোগী হবেন।’

স্বেচ্ছাসেবী সৈয়দা মাহফুজা ঝুমু পেশায় একজন সেবিকা। মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত তিনি। তাঁর ভাষায়, নবজাতককে পৃথিবীতে স্বাগত জানানো হয় দুটি গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে। এটি অন্য রকম উদ্যোগ, এর থেকে সুন্দর বার্তা আর হতে পারে না।

ইতিমধ্যে সংগঠনটির সদস্যরা এক হাজারের বেশি শিশুর নামে গাছ লাগিয়েছেন। সম্প্রতি তোলা

আরেক স্বেচ্ছাসেবী আরিফুল হক বলেন, ‘আমরা তরুণেরা পড়ালেখার পাশাপাশি সংগঠনে সময় দিচ্ছি। প্রকৃতিতে গাছপালার খুব প্রয়োজন। সেটি অনুভব করে আমরা শিশুর জন্মের পর উপহার হিসেবে দুটি করে গাছ নিয়ে যাচ্ছি। এ কাজটি আমাদের জন্য খুব ভালো লাগার ও আনন্দের।’

ঈশ্বরগঞ্জের দত্তপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জ্যোতি রঞ্জন সরকারের বাড়িতে গত ১১ মে নবজাতকের নামে দুটি গাছ লাগিয়ে দেন সংগঠনের সদস্যরা। গাছ উপহার পেয়ে জ্যোতি রঞ্জন সরকার বলেন, ‘এই দুটি গাছের সঙ্গে আমার সন্তানের সম্পর্ক সৃষ্টি হলো। সন্তানকে যেভাবে আদরযত্ন করে বড় করব, গাছগুলোকেও সেভাবে বড় করব।’

তরুণদের এমন উদ্যোগ আরও ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম তালুকদার। তিনি বলেন, ‘একজন শিশুর জন্মের পর দুটি করে গাছ লাগানোর যে উদ্যোগ, তা আমাদের জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব, অক্সিজেনের ভারসাম্য ও পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। এমন উদ্যোগে আরও তরুণেরা এগিয়ে আসবে আশা করছি।’