বাড়ির উঠানে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন শফিকুলের চাচা কাসেম আলী। শুক্রবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর গ্রামে
বাড়ির উঠানে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন শফিকুলের চাচা কাসেম আলী। শুক্রবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর গ্রামে

কৃতজ্ঞতার ওমরাহ হয়ে গেল শেষযাত্রা

শফিকুল ইসলামের (৫৫) মেজ ছেলে তাজবিক (১৯) ফিনল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছিল। আগামী সপ্তাহেই তাঁর ফিনল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল। বড় ছেলে নাবিল (২৪) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে সৌদি আরবের রিয়াদে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দিয়েছেন। ছোট মেয়ে সাদাফ জারা (১৫) রিয়াদের এক স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেলে গোল্ড মেডেল পেয়ে শুরু করেছিল ‘এ’ লেভেল।

সন্তানদের এমন সাফল্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শফিকুল ইসলাম ও তানিয়া তাহমিনা (৪৫) দম্পতি গতকাল বৃহস্পতিবার সপরিবার ওমরাহ করতে যাচ্ছিলেন। সেই ওমরাহ আর করা হয়নি। সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই নিভে যায় একটি পরিবারের আনন্দ ও সব স্বপ্ন।

সপরিবার ওমরাহ করতে যাওয়ার পেছনের গল্প শোনাতে গিয়ে কথা আটকে যাচ্ছিল শফিকুলের ছোট ভাই মহিতুল ইসলামের। বারবার দম নিচ্ছিলেন। সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন বড় ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই ভাতিজা-ভাতিজিকে।

মহিতুল ইসলাম থাকেন ঢাকার উত্তরায়। আজ শুক্রবার বিকেলে মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের তিন সন্তানই লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল। তাদের সাফল্য নিয়ে আমরা সবাই গর্ব করতাম। সন্তানদের ভালো পড়াশোনায় খুশি ছিলেন ভাই ও ভাবি। ভাই-ভাবির এবারের ওমরাহর উদ্দেশ্য ছিল সন্তানদের সাফল্যের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।’ কথাগুলো বলে থেমে যান তিনি। পরে বলেন, ‘সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের যাত্রাই তাঁদের শেষযাত্রা হয়ে গেল। টিভির পর্দায় এত দিন অন্যদের এমন দুর্ঘটনার খবর দেখেছি। কখনো ভাবিনি, একদিন নিজের পরিবার নিয়েই এমন খবর দেখতে হবে।’

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত তানিয়া তাহমিনা, তাঁর ছেলে তাজবিক ও মেয়ে সাদাফ জারা

গতকালের ওই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন তানিয়া তাহমিনা, তাঁর মেজ ছেলে তাজবিক ও মেয়ে সাদাফ জারা। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তানিয়ার স্বামী শফিকুল ইসলাম ও বড় ছেলে নাবিল।

শফিকুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর গ্রামে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি সৌদি আরবে কর্মরত। বিয়ের কিছুদিন পর স্ত্রীকে সেখানে নিয়ে যান। তিন সন্তানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সৌদি আরবেই। তানিয়া তাহমিনার বাবার বাড়ি ফরিদপুরের সালথার আটঘর ইউনিয়নের পুটিয়া গ্রামে।

আজ দুপুরে ভৈরবের আকবরনগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শফিকুলের বাড়িতে স্বজনদের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও ভিড় করছেন। শফিকুলের পরিবার গ্রামে না থাকলেও তাঁর তিন চাচা ও পরিবারের সদস্যরা সেখানে বসবাস করেন।

বাড়ির সামনে শোকার্ত স্বজন ও প্রতিবেশীরা। শুক্রবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আকবরনগর গ্রামে

বাড়ির উঠানে বসে কথা হয়, শফিকুলের চাচা কাসেম আলীর সঙ্গে। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘এক বছর আগে শফিকুল স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গ্রামে এসেছিল। ওটাই ওদের সাথে শেষ দেখা। এরপর ফোনে নিয়মিত কথা হতো। আমি অসুস্থ। কিছুদিন আগে শফিকুল ফোন করে খোঁজ নিয়েছে, চিকিৎসার খরচও দিয়েছে। ভাতিজা-ভাতিজিরাও কথা বলত। তাজবিক আমার অসুস্থতা নিয়ে চিন্তা করতে মানা করত। বলত, “চাচা, আল্লাহ সব ঠিক করে দেবেন। আপনি সুস্থ হয়ে আগের মতো হাঁটবেন।” আজ সেই কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছে।’

পাশেই বসেছিলেন শফিকুলের বড় ভাই করম আলী। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, অনেক বছর ধরে তারা গ্রামে থাকে না। কিন্তু কখনো মনে হয়নি, তারা দূরে আছে। নিয়মিত খোঁজখবর নিত। ঈদে দেশে এলে গ্রামের সবাইকে নিয়ে আনন্দ করত।

শফিকুলের ভাতিজা মো. রুবেল এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, ওই দুর্ঘটনায় একসঙ্গে তাঁদের পরিবারের তিনজনকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দেশে থাকলে কোনো ঈদই তারা গ্রামের বাড়ি ছাড়া করত না। ঈদে সবাই একসঙ্গে আনন্দ করতাম। এখন ভাবতেই পারছি না, তারা আর কোনো দিন ফিরবে না।’

সবার কথা শুনে আঁচল দিয়ে চোখ ঢেকে কাঁদতে থাকেন শফিকুলের চাচি মিনা বেগম।

পরিবারের সদস্যরা জানান, আজ সৌদি আরবেই জানাজা শেষে তানিয়া তাহমিনা, তাজবিক ও সাদাফ জারার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আহত শফিকুল ইসলাম ও নাবিল এখন অনেকটা সুস্থ।