নোয়াখালীতে পানিতে ডুবে ৪ দিনে ১০ শিশুর মৃত্যু

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু
প্রতীকী ছবি

নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় গত ৪ দিনে পানিতে ডুবে ১০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল বুধবার এক দিনে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়। জেলার কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সদর, সেনবাগ ও হাতিয়া উপজেলায় এসব শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু এখন একটি দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সচেতনতামূলক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

গত রোববার থেকে গতকাল পর্যন্ত নোয়াখালীতে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের বয়স ১৯ মাস থেকে ১১ বছর। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সোহেল সারওয়ার প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণত বলা হয়, পানিতে ডুবে কিংবা অনেক পানি খেয়ে শিশু মারা গেছে। পানিতে ডুবলে কত সময়ের মধ্যে হাসপাতালে নিতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কখন শিশু পানিতে পড়েছে, তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারে না।

তবে পানিতে পড়ে শিশুমৃত্যুর কয়েকটি কারণের মধ্যে—পেটের মধ্যে পানি বা কাদা ঢুকে ফুসফুস বন্ধ হয়ে আসা, অক্সিজেনের স্বল্পতা, ভয় পেয়ে হার্ট অ্যাটাক অন্যতম। এসব ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিশুকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়ে শিশুদের পানিতে পড়া রোধ করা যেতে পারে।

জেলার সরকারি ও বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছে ইতিপূর্বে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল দুপুরে কবিরহাট উপজেলার চাপরাশিরহাট ইউনিয়নের রামেশ্বরপুর গ্রামের ছিদ্দিক ভূঁইয়া বাড়ির আবু নাছেরের ছেলে মো. রিফাত (৯) ও তার ভাই মো. রিফান (৭) বাড়ির পাশে পুকুরের পানিতে পড়ে তলিয়ে যায়। তাদের উদ্ধার করে কবিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দুই ভাইকে মৃত ঘোষণা করেন।

একই দিন সকালে হাতিয়া উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের লামছরি গ্রামের নিজাম উদ্দিনের মেয়ে নিহা আক্তার (৫), কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাহী ইউনিয়নের চর গাঙচিলের ১৯ মাস বয়সী শিশু আবুবকর, সুবর্ণচর উপজেলার চর বৈশাখী গ্রামের রিয়া বেগম (৯) ও তার চাচাতো বোন নাসরিন আক্তার (১১) পানিতে ডুবে মারা যায়।

এর আগে রোববার সদর উপজেলার পূর্ব চরমটুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ জগৎপুর গ্রামের মো. সোহেলের ছেলে মো. সোহান (২), সোমবার সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলি ইউনিয়নের দক্ষিণ কচ্ছপিয়া গ্রামের মামুন হোসেনের মেয়ে সামিয়া আক্তার (২) ও চরজব্বার ইউনিয়নের মো. আরিফ হোসেনের মেয়ে বিবি আয়েশা (২২ মাস), সেনবাগ উপজেলার কাদরা ইউনিয়নের পুরুষ্কর গ্রামের নিজাম উদ্দিনের মেয়ে নিঝুম আক্তার (৬) পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যায়।

এসব মৃত্যুর ঘটনায় নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে জানান সেসব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। নোয়াখালী নারী অধিকার জোটের সভাপতি লায়লা পারভিন বলেন, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু এখন একটি দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মা সমাবেশে মায়েদের সচেতন করতে হবে। জনপ্রতিনিধিরা গ্রামে গ্রামে মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করতে পারেন।

মসজিদে জুমার দিনে ইমাম সাহেবরা এ বিষয়ে বাবাদের সচেতন করতে পারেন। এ ছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তা ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের অধীন বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে পারে।

সাধারণত বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা বেশি লক্ষ করা যায়। এ বিষয়ে নোয়াখালীর সিভিল সার্জন চিকিৎসক মাসুম ইফতেখার বলেন, পানিতে পড়া শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে এরই মধ্যে প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেবুলাইজার যন্ত্র ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পানিতে ডোবার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিশুদের হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারলে শিশু মারা যাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। নিউমোনিয়ার পর পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হারই এখন সবচেয়ে বেশি। এ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।