ধুনট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

অস্ত্রোপচার নয়, স্বাভাবিক প্রসবে তাঁদের আস্থা

২০২১ সালে স্বাভাবিকভাবে ১১৭ শিশু জন্ম নিয়েছে। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৩। 

ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি কক্ষে চিকৎসাসেবা দিচ্ছেন আশরাফুল ইসলাম
প্রথম আলো

বগুড়া জেলা শহর থেকে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে। এখানে অ্যাম্বুলেন্স মাত্র একটি। শহরের যাতায়াতের সড়কগুলো বেহাল। সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। এর মধ্যে যদি প্রসববেদনা ওঠে, তখন কোনো প্রসূতিকে অ্যাম্বুলেন্স না পেলে পাঠাতে হয় অটোরিকশায়। এতে গন্তব্য পৌছার আগেই সড়কে অনেক সময় প্রসূতির নানা ধরনের শারীরিক ভয়াবহ জটিলতা দেখা দেয়। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে চিকিৎসা খরচ যেমন বেশি হয়, তেমনি প্রসূতিদের মৃত্যুঝুঁকিও থাকে।

২০২২ সালে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেন আশরাফুল ইসলাম। তিনি প্রসূতি চিকিৎসাসেবার এই দুরবস্থা দেখে প্রথমে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নরমাল ডেলিভারির (স্বাভাবিক প্রসব) কার্যক্রম হাতে নেন। এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারও চালানো হয়। এর পর থেকে এখানে স্বাভাবিকভাবে সন্তানে প্রসবের সংখ্যা বেড়ে যেতে থাকে। 

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১১৭ শিশু নরমাল ডেলিভারিতে হয়েছে। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৩। সেই ধারাবাহিকতায় এবার জানুয়ারিতে ৪৮, ফেব্রুয়ারিতে ৪৫, মার্চে ৪৩, এপ্রিলে ৪১, মে মাসে ৪০টিসহ ৪ মাসে ২১৭ শিশু নরমাল ডেলিভারিতে জন্ম গ্রহণ করে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এখন প্রসূতিদের কাছে আস্থার প্রতীতে পরিণত হয়েছে।

৫ মে সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি পর্যবেক্ষণকক্ষে স্বপ্না খাতুন ও শাপলা খাতুন নামের দুজন প্রসূতি তাঁদের সন্তানদের নিয়ে বসে আছেন। এ সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্স নিয়ে ওই দুই প্রসূতি ও তাঁদের সন্তানদের চিকিৎসাসেবা দেন। ওই দুই মা ৪ মে রাতের শেষ দিকে প্রসববেদনা নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। পরদিন সকালে অস্ত্রোপচার ছাড়াই স্বাভাবিক নিয়মে ডাক্তার ও অভিজ্ঞ নার্সদের সহযোগিতায় তাঁরা সন্তান জন্ম দেন।

ওই দুই মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শরীরে অস্ত্রোপাচার ছাড়া স্বাভাবিভাবে সন্তান প্রসব করানোর ফলে তাঁরা ভালো ও সুস্থ আছেন। এ সময় ওই দুই প্রসূতি ছাড়াও চিকিৎসক এবং নার্সদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে এভাবে প্রতিদিন দুই থেকে তিনজন করে প্রসূতি আসেন। তাঁরা প্রসূতিদের অস্ত্রোপচার ছাড়াই নরমাল ডেলিভারি করান। শরীরে অস্ত্রোপচার না করায় এসব মায়েরা স্বল্প সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে সন্তান নিয়ে বাড়িতে ফিরে যান।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মিডওয়াইফ ইনচার্জ নাজমুন নাহার প্রথম আলোকে জানান, ‘যেসব প্রসূতি মায়েদের ডায়াবেটিস, হাই ব্লাডপ্রেশার ইত্যাদি আছে বা বাচ্চা আকারে বড় হয় বা হার্ট রেট বেড়ে যায় এবং কমে যায়, সেসব ক্ষেত্রে তাঁদের বেলায় আমরা কোন ঝুঁকি নিই না। আর এগুলো যদি না থাকে, তাঁদের আমরা নরমাল ডেলিভারি করে থাকি।’ 

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আরও বলেন, নরমাল ডেলিভারি মা ও শিশু উভয়ের জন্যই অনেক ভালো। ডেলিভারির ১২ ঘণ্টার মধ্যেই মায়েদের হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়া সম্ভব হয়। নরমাল ডেলিভারি করানো মায়েরা খুব দ্রুত শিশুদেরকে বুকের দুধ পান করাতে পারেন এবং খুব কম সময়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। এসব কারণে নরমাল ডেলিভারিতে প্রসূতি মায়েরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশী অগ্রহী হয়ে উঠেছেন।