কক্সবাজারের শহরের প্রধান সড়কের ঘুমগাছতলায় আম করছেন এক বিক্রেতা। গত মঙ্গলবার দুপুরে তোলা
কক্সবাজারের শহরের প্রধান সড়কের ঘুমগাছতলায় আম করছেন এক বিক্রেতা। গত মঙ্গলবার দুপুরে তোলা

কক্সবাজারে বিক্রি হচ্ছে অপরিপক্ব আম-লিচু, ঠকছেন ক্রেতারা

‘চার কেজি আম কিনেছিলাম ১১০ টাকায়। বিক্রেতা বলেছিলেন, “আমগুলো রাজশাহীর আম্রপালি”। কিন্তু ঘরে নিয়ে খাওয়ার পর মনে হয়েছে, আমের নাম আর স্বাদের মধ্যে কোনো মিলই নেই।’

কথাগুলো বলছিলেন রহিম উল্লাহ। তিনি কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা। তাঁর মতো একই অবস্থা শিবানী ধরের। গত মঙ্গলবার শহরের ঘুমগাছতলা এলাকায় গিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি তখন লিচু কিনছিলেন। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই দিন আগে লিচু কিনেছিলাম। কিন্তু এতে স্বাদ-গন্ধ কিছুই ছিল না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খোসা কালো হয়ে ভেতরটা নরম হয়ে গেছে।’

‘আড়তে যা পাওয়া যায়, আমরা সেটাই বিক্রি করি। দূর-দূরান্তে গিয়ে কেমিক্যালমুক্ত ফল কিনে আনার সামর্থ্য আমাদের নেই।’
মো. তারেক, ফল বিক্রেতা

অবশ্য শুধু রহিম ও শিবানী নয়, কক্সবাজার শহরের অনেক ক্রেতার অভিযোগ একই। বাজারজুড়ে নানা নামে বিক্রি হচ্ছে অপরিপক্ব আম ও লিচু। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে বেশি লাভের আশায় অনেকেই ফল আগেভাগে গাছ থেকে পেড়ে কৃত্রিমভাবে পাকান। এসব ফল বাইরে থেকে পাকা দেখালেও ভেতরে কাঁচা ও টক হয়।

গত মঙ্গলবার সকালে শহরের লালদিঘির পাড় থেকে ঝাউতলা বিমানবন্দর সড়কের মোড় পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ৩০টি দোকানে আম ও লিচু বিক্রি করতে দেখা যায়। প্রতি কেজি আম বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। আর ১০০ লিচুর জন্য দাম রাখা হচ্ছে ৪০০ টাকা।

ক্রেতাদের অভিযোগ, লালদিঘির পাড়, বন বিভাগ ও বিমানবন্দর সড়কের আশপাশের দোকানগুলো থেকে ফল কিনে বেশি প্রতারিত হচ্ছেন তাঁরা। হিমসাগর বা আম্রপালি বলে যে আম বিক্রি হচ্ছে, এর অনেকগুলোই পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার ছোট জাতের অপরিপক্ব আম। বেশি লাভের আশায় আগেভাগে গাছ থেকে পেড়ে ফেলায় এসব আম ফ্রিজে রাখলেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কক্সবাজার শহরে লিচু বিক্রি করছেন এক বিক্রেতা। গত মঙ্গলবার তোলা

ফল বিক্রেতা সাগর দাশ, শিবু দাশ ও মো. তারেক বলেন, তাঁরা রাজশাহীর আম্রপালি, সাতক্ষীরার হিমসাগর কিংবা পাবনার লিচু নামে ফল বিক্রি করলেও প্রকৃতপক্ষে এসব জেলায় কখনো যাননি। ট্রাকে করে আসা ফল আড়ত থেকে কিনেই তাঁরা বিক্রি করেন।

বাজারে পাওয়া ফলে ভেজালের কথা স্বীকার করেন বিক্রেতা মো. তারেক। তিনি বলেন, ‘আড়তে যা পাওয়া যায়, আমরা সেটাই বিক্রি করি। দূর-দূরান্তে গিয়ে কেমিক্যালমুক্ত ফল কিনে আনার সামর্থ্য আমাদের নেই।’

তারেকের কথার সত্যতা পাওয়া যায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ফলের স্থায়িত্ব বাড়াতে অনেক সময় উৎপাদন এলাকাতেই বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। আর শহরের কস্তুরাঘাট এলাকায় কাঁচা কলা রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হচ্ছে।

লালদিঘির পাড়ের ‘মেসার্স আল মদিনা ফার্ম’ আড়তের মালিক মো. আবু তাহের বলেন, ‘সকালে পাবনা থেকে দুই ট্রাক লিচু এবং চট্টগ্রাম থেকে এক হাজার কেজি আম এসেছে। বেশি দাম পাওয়ার আশায় অনেকেই আগেভাগে গাছ থেকে আম পেড়ে বাজারজাত করেন। তাই স্বাদ বা মিষ্টতা ঠিকমতো আসে না।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কক্সবাজারে ২২২ একর জমিতে দেশীয় জাতের লিচুর আবাদ হয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝিতেই সেগুলোর মৌসুম শেষ হয়ে গেছে। জেলার কয়েক শ আমবাগানের ফলও প্রায় শেষের পথে। বর্তমানে বাজারে থাকা অধিকাংশ আম ও লিচুই বাইরের জেলা থেকে আসছে।

দিনাজপুর থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দিনাজপুরের বেদানা ও মাদ্রাজি লিচু বাজারে আসতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। কিন্তু সেই সুনাম ব্যবহার করে এখন নিম্নমানের লিচু বিক্রি করা হচ্ছে।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, ফল স্বাভাবিকভাবে পাকার আগেই অনেকেই রাসায়নিক ব্যবহার করেন। এতে ফল দ্রুত আকর্ষণীয় রং ধারণ করে। বাইরে থেকে পাকা মনে হলেও ভেতরে কাঁচা ও স্বাদহীন থেকে যায়। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

কীভাবে চিনবেন ভালো ফল

কৃষি বিভাগ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখলে প্রতারণার ঝুঁকি কমানো যায়। প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমে বোঁটার কাছে মিষ্টি সুবাস থাকবে। কৃত্রিমভাবে পাকানো আমে সাধারণত ঘ্রাণ থাকে না, কখনো কখনো ওষুধের মতো গন্ধ পাওয়া যায়। আবার গাঢ় সবুজ আম রাতারাতি সমানভাবে হলুদ হয়ে গেলেও ভেতরে শক্ত বা টক থাকলে তা রাসায়নিক প্রয়োগের লক্ষণ হতে পারে।

একইভাবে লিচুর খোসা অতিরিক্ত উজ্জ্বল লাল হলেও যদি বোঁটার অংশ সবুজ থাকে, তাহলে সেটি কৃত্রিমভাবে পাকানো হতে পারে। আসল চায়না-৩ বা বেদানা লিচুর বিচি ছোট ও চ্যাপটা হয়, শাঁস থাকে মোটা ও মিষ্টি। কর্মকর্তারা ফল কেনার পর ভালোভাবে ধুয়ে কিছুক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রেখে খোসা ছাড়িয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

জেলা কৃষি দপ্তরের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশীষ কুমার বলেন, ‘পাবনা বা ঈশ্বরদীর পরিচয়ে বাজারে যে লিচু বিক্রি হচ্ছে, এর অনেকগুলোই প্রকৃত চায়না-৩ বা বেদানা নয়। আসল চায়না-৩ বা বেদানা লিচুর ৯৫ শতাংশ অংশই মাংসল থাকে ও বিচি হয় ছোট। বাজারে এখন অপরিপক্ব ফল বিক্রি হওয়ায় ভোক্তারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এসব লিচু দুই-তিন দিনের মধ্যেই কালো হয়ে যায়।’