১৯৯৭ সালে একটি এনজিও সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় পাঁচ হাজারের বেশি গাছ লাগিয়েছিল।

গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। এর দুই ধারে অসংখ্য মরা গাছ। সেই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে মরা গাছের ডাল, ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। এই দৃশ্য দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার আলিহাট ও বোয়ালদাড় ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (এনডিসি) নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় উপজেলার আলিহাট ও বোয়ালদাড় ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম ও পৌরসভার কিছু এলাকার রাস্তার দুই পাশে পাঁচ হাজারের বেশি গাছ লাগায়। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে আকাশমনি, মেহগনি, শিশুকাঠ ও ইউক্যালিপটাস। কর্মসূচির চুক্তি অনুযায়ী, এনডিসি, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ও সুবিধাভোগীদের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ১০ বছর মেয়াদে গাছগুলো লাগানো হয়েছিল। পরে সংস্থাটি ওই সব রাস্তার আশপাশের গ্রাম থেকে কয়েক শ নারী-পুরুষকে গাছের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার কথা বলে ২৫টি সমিতি গঠন করে। প্রতিটি সমিতিতে ১০-১৫ জন সদস্য ছিলেন। তখন সমিতির প্রত্যেক সদস্যের কাছ থেকে পাস বইয়ের মাধ্যমে মাসিক ১০ টাকা হারে সঞ্চয় তোলা হয়। অধিকাংশ সদস্যের ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন।
চার থেকে পাঁচ বছর ধরে সংস্থা থেকে সঞ্চয়ের টাকা তোলার পর হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় কার্যক্রম। সদস্যদের কোনো কিছু না জানিয়ে কার্যক্রম গুটিয়ে চলে যান সংস্থার লোকজন। পরে সমিতির সদস্যরা আমানতের টাকার জন্য মাঠকর্মীদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও আমানত ফেরত পাননি। এ ছাড়া আইনি জটিলতায় গাছ কাটতে না পারায় গাছের টাকার ভাগও পাননি সুবিধাভোগীরা।
এদিকে রাস্তায় মরা গাছের নিচ দিয়ে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। গত কয়েক বছরে রাস্তায় কয়েক শ গাছ চুরি হয়েছে। গত শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, বোয়ালদাড় ইউনিয়নের ছাতনী চারমাথা থেকে খাট্টাউছনা, মোল্লাবাজার থেকে খাট্টাউচনা, মোল্লাবাজার থেকে কলন্দপুর ও রাঙ্গামাটিয়া থেকে চারমাথা বাজার এলাকার রাস্তায় অসংখ্য মরা গাছ। এ ছাড়া আলিহাট ইউনিয়নের হরিহরপুর থেকে ইশবপুর, হরিহরপুর থেকে জাংগই, জাংগই থেকে টুব্বী, জাংগই থেকে খাট্টাউচনা, জাংগই থেকে মুংরা ও সাদুরিয়া থেকে ভাটরা গ্রাম পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে মরা গাছে। এসব স্থানে এক হাজারের বেশি গাছ মরে গেছে। মরা গাছে কাঠপোকা বাসা বেঁধেছে।
সাদুরিয়া গ্রামের ভ্যানচালক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, তিনি এই রাস্তায় যাত্রী নিয়ে যাওয়া-আসার সময় অনেক আতঙ্কে থাকেন। এ রাস্তা দিয়ে অনেক ভ্যান, রিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করে। এ মরা গাছগুলো যেকোনো সময় মানুষের মাথার ওপর পড়ে ক্ষতি হতে পারে।
এনডিসির সাবেক মাঠকর্মী ও খাট্টাউচনা গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদ হাসান বলেন, ‘উপজেলায় ২৫-৩০টি সমিতি গঠন করা হয়েছিল। প্রথমে সমিতির সদস্যরা ১০ টাকা করে মাসিক সঞ্চয় দিতেন। পরে সংস্থাটি ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালু করে। এটি কয়েক বছর চলার পর হঠাৎ করে সংস্থাটি হাকিমপুর উপজেলায় তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে এখান থেকে চলে যায়।’
আলিহাট ইউনিয়নের ভাটরা গ্রামের বাসিন্দা ও সামাজিক বনায়ন সমিতির সদস্য মোসলেমা বেগম বলেন, ‘পাস বইয়ের মাধ্যমে ১ হাজার ৭৮১ টাকা জমা করেছি। গাছের শেয়ার পাচ্ছি না, সঞ্চয়ের টাকাও পাচ্ছি না।’
এনডিসির নির্বাহী পরিচালক দেওয়ান মো. কামরুজ্জামান মুঠোফোনে বলেন, গাছগুলো কাটার জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। গাছ কাটা হলে সমিতির সদস্যরা উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাস বই জমা দিলে গাছের লভাংশসহ তাঁদের সমুদয় অর্থ ফেরত পাবেন।
আলিহাট ইউপির চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ান বলেন, ‘রাস্তায় গাছ লাগানোর সময় ১০ বছরের চুক্তি ছিল। চুক্তির মেয়াদ পার হয়ে গেছে। এনডিসি ইউনিয়নের রাস্তায় আরও ১০ বছর ব্যবহার করেছে। এই হিসাবে এনডিসি কোনো টাকা পাবে না। গাছগুলো কাটার জন্য ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেছি।’
এ বিষয়ে হাকিমপুরের ইউএনও মোহাম্মদ নূর-এ আলম বলেন, ‘রাস্তার গাছগুলো কাটার বিষয়ে আলিহাট ও বোয়ালদাড় ইউপির চেয়ারম্যানের কাছ থেকে দুটি আবেদন পেয়েছি। গাছগুলোর মূল্য নির্ধারণের জন্য বন বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’