সরেজমিন ভূরুঙ্গামারী

সারের বরাদ্দে ঘাটতি ও বিতরণে সমস্যার কথা বলছেন কৃষকেরা

সারের খোঁজে জড়ো হয়েছেন কৃষকেরা। তাঁদের সার সরবরাহের আশ্বাস দিচ্ছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। গতকাল দুপুরে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ধলডাঙ্গা বাজারে
ছবি: প্রথম আলো

আবাদি জমির তুলনায় সারের বরাদ্দ কম। সরকার-নির্ধারিত পরিবেশকদের বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত খোলা হয় না। আবার এক জায়গার সার বিক্রি হয় আরেক জায়গায়। পরিবেশকদের বেশির ভাগ গুদাম ইউনিয়নের বাইরে। অন্যদিকে চাহিদার বিপরীতে যেটুকু সার বরাদ্দ হয়, সেটুকুও সময়মতো কৃষকের কাছে পৌঁছায় না।

মূলত এই পাঁচ কারণে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে পরিবেশকের (ডিলার) গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটেছে। গতকাল সোমবার সকালে কুড়িগ্রাম জেলা সদর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে শিলখুড়ি ইউনিয়নে যান প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সাড়ে ৪ ঘণ্টা ভূরুঙ্গামারী উপজেলা সদর ও শিলখুড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম-বাজার ঘুরে কৃষক, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, সার পরিবেশক, রাজনৈতিক নেতা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

স্থানীয় কৃষকেরা অভিযোগ করেন, আমন ধান রোপণের পর প্রয়োজনীয় সার তাঁরা পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।

শিলখুড়ি ইউনিয়নের পাগলার হাট এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী ১২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ধান রোপণের ২১ দিনের মধ্যে সার দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু ২৬ দিনেও তিনি সার পাননি। তাঁর ভাষ্য, সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে খোলাবাজারে সার কিনতে হচ্ছে।

ইউনিয়নের আরেক কৃষক আজিজুল হক বলেন, ‘ধান চাষ করে নিজের বিপদ নিজেই এনেছি। এখন সারের জন্য ঘুরব, নাকি জমিতে ধানের পরিচর্যা করব?’

ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় চলতি রোপা আমন মৌসুমে ১৬ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। যার বিপরীতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১২৪ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে শিলখুড়ি ইউনিয়নে বরাদ্দ ১১৯ দশমিক ৯ মেট্রিক টন। এই ইউনিয়নে আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় কৃষকেরা আমন আবাদে প্রতি বিঘায় গড়ে ৮০ কেজি সার ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ইউরিয়া ৩০ কেজি, টিএসপি ১৫ কেজি, ডিএপি ২০ কেজি ও এমওপি ১৫ কেজি। সেই হিসাবে শিলখুড়িতেই প্রায় ১ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন সার প্রয়োজন। এর মধ্যে ইউরিয়া সারের ঘাটতি আরও বেশি। প্রতি বিঘায় ৩০ কেজি হিসাবে ইউরিয়া প্রয়োজন প্রায় ৪৩৮ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন। কিন্তু শিলখুড়ি ইউনিয়নে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৬৮ মেট্রিক টন।

উপজেলায় ও প্রতিটি ইউনিয়নে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সারের সরবরাহ রয়েছে বলে দাবি করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুল জব্বার।

যদিও কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, শিলখুড়ি ইউনিয়নে প্রয়োজনের তুলনায় সার কম পৌঁছাত। ফলে সেখানে সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য ইউনিয়ন থেকে সার সমন্বয় করে শিলখুড়িতে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সারের খোঁজে জড়ো হয়েছেন কৃষকেরা। গতকাল সোমবার দুপুরে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ধলডাঙ্গা বাজারে

গত রোববার বেলা ১১টার দিকে শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে এক পরিবেশকের গুদামের বেড়া ভেঙে কৃষকেরা ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান। পরে প্রশাসনের তৎপরতায় গতকাল বিকেল পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সার ফেরত দিয়েছেন কৃষকেরা। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে উপজেলা প্রশাসন।

নিয়মিত খোলে না বিক্রয়কেন্দ্র

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কৃষকদের কাছে সার বিক্রির জন্য ইউনিয়নে ‘ডিলার পয়েন্ট’ রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কোনো কোনো পরিবেশকের মূল গুদাম ইউনিয়নের বাইরে উপজেলা সদরে বা নিজের এলাকায়। ফলে বরাদ্দ করা সার সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে অন্য জায়গায় মজুত থাকে। সেখান থেকে কী পরিমাণ সার কোথায় বিক্রি হচ্ছে, তা জানা যায় না।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিলখুড়ি ইউনিয়নের পরিবেশক তাইফুর রহমান। তাঁর সারের গুদাম শিলখুড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ভূরুঙ্গামারী সদর ইউনিয়নের পাশে।

উপজেলার পাথরডুবি ও তিলাই ইউনিয়নের পরিবেশক সইদুল ইসলাম ব্যাপারী ও তাঁর স্ত্রী ডেইজি বেগম। এই দুই পরিবেশকের সারের গুদাম উপজেলা সদরের সাদ্দাম মোড়ে। আন্ধারীঝাড়, চর ভূরুঙ্গামারী ও বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের তিন পরিবেশক জনার্দন সাহা, নিতাই সাহা ও মন্টেন্ড সাহা। তাঁদের সারের মূল গুদাম উপজেলা সদরের বাঘভাণ্ডার এলাকায়।

ইউনিয়নে গুদাম না থাকার বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুল জব্বার বলেন, কোনো পরিবেশকের গুদাম উপজেলা শহরে থাকতেই পারে। পরিবেশক বিক্রয়কেন্দ্রে সার বিতরণের সময় সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন এবং বরাদ্দ অনুযায়ী বিতরণ হলো কি না, সেটি মিলিয়ে দেখেন।

ইউনিয়নের বিক্রয়কেন্দ্রগুলো নিয়মিত খোলা না থাকায় সময়মতো সার পান না বলেও অভিযোগ কৃষকদের। শিলখুড়ি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান (৪০) গত এক সপ্তাহ থেকে প্রতিদিন ধলডাঙ্গা বাজারে ‘ডিলার পয়েন্টে’ এসে ঘুরে গেছেন। এক দিনও খোলা পাননি।

মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শনিবার সার আসার খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন। পরে শুনতে পান রোববার সকাল থেকে বিতরণ করা হবে। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্রসহ রোববার সকাল আটটায় এসে লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু পরিবেশক আসেন সাড়ে নয়টায়। তখন সংকটের কথা বলে সার বিতরণ না করে অপেক্ষা করতে থাকেন। পরে কৃষকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে সার গুদাম থেকে জোর করে নিয়ে যান।

সার নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ

সার বিতরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিলখুড়ির পরিবেশক তাইফুর রহমানের পরিবার জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি শিলখুড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীসহ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

তাইফুরের সঙ্গে থাকা বিএনপির কয়েকজন নেতা সার বিক্রির ক্ষেত্রে ‘পারসেন্টেজ’ নেন এবং বাইরে সার বিক্রি করেন বলে অভিযোগ করেছেন কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমানের শ্যালক আবদুল লতিফ। তিনি বলেন, গত রোববার কৃষকেরা ওই নেতাদের ডিলার পয়েন্টে দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি গিয়ে কৃষকদের শান্ত করেছেন।

তবে পরিবেশক তাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী সার বিতরণের সময় উপস্থিত থাকায় আবদুল লতিফ ও তাঁর অনুসারীরা কৃষকদের উসকানি দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। পরে কয়েকজন কৃষক গুদাম থেকে সার জোর করে নিয়ে যান। এ কথা তিনি ভূরুঙ্গামারী থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতেও (জিডি) উল্লেখ করেছেন।

কৃষকদের সার নেওয়ার জন্য উসকানি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন আবদুল লতিফ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে সার নেওয়ার জন্য উসকানি দিইনি। সরকারের ভাবমূর্তি যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য সার বিতরণের সময় ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম।’

একজনের বরাদ্দের সার বিক্রি করেন আরেকজন

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১০টি ইউনিয়নে কৃষক আছেন ৬১ হাজার ১৯০ জন। তাঁদের জন্য বিসিআইসির (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন) পরিবেশক আছেন ১০ জন। এ ছাড়া বিএডিসির (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) পরিবেশক রয়েছেন সাতজন। বিসিআইসি পরিবেশকেরা ইউরিয়াসহ সব ধরনের সার বিক্রি করতে পারেন। আর বিএডিসি পরিবেশকেরা টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার বিক্রি করেন।

শিলখুড়ি ইউনিয়নের বিসিআইসি পরিবেশকের প্রতিনিধি সহিদুল ইসলাম বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিসিআইসি পরিবেশকের কাছ থেকে প্রতি চালানে ১০০ বস্তা করে সার বিএডিসির পরিবেশক নূর ইসলামকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে সেই অনুযায়ী সার দেওয়া হয়েছে।

নূর ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, তাঁর কাছে যে সার আসে, তা খোলাবাজারে ৫ ও ১০ কেজি করে বিক্রি করেন। তিনি দাবি করেন, সরকার-নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করেন, অতিরিক্ত দাম নেন না।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বার বলেন, কোনো খুচরা বিক্রেতা বা বিএডিসি পরিবেশককে সার দেওয়ার বিধান নেই। তবে বিএডিসির ওই পরিবেশক কার্ডধারী, তাই তাঁকে কিছু সার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

গত রোববার পাগলার হাট বাজারে বিক্রেতা নূর ইসলামের দোকানে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। সেখানে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে সার বিক্রির অভিযোগে তাঁকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিসিআইসি পরিবেশকের সার কেটে বিএডিসি পরিবেশকের বিক্রয়কেন্দ্রে দেওয়ার সুযোগ নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ কাজ করে থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে।