সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে আবার বাড়ছে নদ-নদীর পানি। আজ শুক্রবার দুপুরে জেলা সদরের সুরমা নদীর লঞ্চঘাট থেকে তোলা
সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে আবার বাড়ছে নদ-নদীর পানি। আজ শুক্রবার দুপুরে জেলা সদরের সুরমা নদীর লঞ্চঘাট থেকে তোলা

সুনামগঞ্জে তিন দিনে ২৪২ মিলিমিটার বৃষ্টি, আবারও পানি বাড়ছে নদী ও হাওরে

টানা বৃষ্টিতে আবারও বাড়তে শুরু করেছে সুনামগঞ্জের নদ–নদী ও হাওরের পানি। এতে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন হাওরের কৃষকেরা। অবশিষ্ট বোরো ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে তাঁদের মধ্যে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিনও ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় পাহাড়ি ঢল নেমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে আজ শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার জেলায় ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। সব মিলিয়ে গত তিন দিনে জেলায় ২৪২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

এ সময়ে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ১৩ সেন্টিমিটার। আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় নদীর পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ৭২ মিটার নিচে ছিল। প্রাক্–বর্ষা মৌসুমে সুরমা নদীর বিপৎসীমা ৬ দশমিক ৫ মিটার।

সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশরী মামুন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, সুনামগঞ্জ ও উজানে চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এতে নদী ও হাওরের পানি বাড়বে। কৃষকের ফসলের ক্ষতি হতে পারে। তবে আপাতত বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা নেই।

হাওরের কৃষকেরা জানান, বৈশাখের শুরু থেকেই বৃষ্টির কারণে ধান ঘরে তুলতে ভোগান্তিতে পড়েছেন তাঁরা। মাঝেমধ্যে এক–দুই দিন রোদ মিললেও আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ধান শুকানো যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় কাটা ধান খেতেই পড়ে আছে।

জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫২) বলেন, গত বুধবার পর্যন্ত টানা চার দিন দিনে রোদ ছিল। এতে কৃষকেরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে আবার দিন–রাত বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

রফিকুলের ভাষ্য, ‘ইবার হাওরে বৈশাখটা আমরার বড় দুর্ভোগের। ইলা মেঘ (বৃষ্টি) আগে অইছে না। অখন ত যে অবস্থা, বাকি ধান তোলাই যাইত না। সব নষ্ট অইজিবো।’

জেলার হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, দুর্যোগ যেন এ বছর কৃষকদের পিছু ছাড়ছে না। এক দিন আবহাওয়া ভালো থাকলে পরের দুই দিনই বৃষ্টি হচ্ছে। অন্তত এক সপ্তাহ টানা রোদ থাকলে কৃষকেরা অবশিষ্ট ধান তুলতে পারতেন। কিন্তু আবহাওয়ার যে পরিস্থিতি, তাতে সেটি সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি ছোট–বড় হাওরে এবার বোরো আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ টন ধান।

এ পর্যন্ত জেলায় গড়ে ৮৭ দশমিক ৪০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। মোট কাটা হয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমির ধান। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে কাটা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩১ হেক্টর। সেই হিসাবে এখনো প্রায় ১৩ শতাংশ ধান কাটার বাকি রয়েছে।

কৃষি বিভাগের ১০ দিন আগের হিসাব অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে সুনামগঞ্জে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার বেশি। তবে এরপর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আর হালনাগাদ করা হয়নি। স্থানীয় কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, এখনো চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ করা হয়নি। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

সুনামগঞ্জে চলতি মৌসুমে মার্চের মাঝামাঝি থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়। এতে অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ধানের ক্ষতি হয়। পরে ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া অতিভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রায় সব হাওরেই বোরো ধান তলিয়ে যায়।