সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার কুরশি গ্রামের দুটি বাড়িতে উত্তেজিত জনতার হামলা। বুধবার দুপুরে
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার কুরশি গ্রামের দুটি বাড়িতে উত্তেজিত জনতার হামলা। বুধবার দুপুরে

চোর নির্মূল কমিটির সভা থেকে ২ ‘চোরের’ বাড়িতে এলাকাবাসীর হামলা-ভাঙচুর

একের পর এক চুরির ঘটনায় অতিষ্ঠ ছিলেন গ্রামবাসী। মাঝখানে ‘চোরদের’ কাছ থেকে নেওয়া হয় মুচলেকা। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। তাই করণীয় ঠিক করতে গ্রামবাসী বৈঠকে বসেন। ‘চোর নির্মূল কমিটির’ সেই বৈঠক থেকে উত্তেজিত জনতা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালান চুরির অভিযোগ ওঠা দুজনের বাড়িতে।

আজ বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের দক্ষিণ কুরশি গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। দুজনের বাড়িতে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। এতে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা মন্তব্য। অনেকে হামলা ও ভাঙচুরের সমালোচনা করছেন।

ভিডিওতে দেখা যায়, একটি টিনের চালা ও বেড়ার ঘরের সামনে মধ্যবয়সী এক নারী দুই বছরের এক শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে হামলা না করার অনুরোধ করছেন লোকজনকে। তাঁর আরেক হাতে ছিল রামদা। কিন্তু লোকজন ওই নারীর কথায় কান না দিয়ে তাঁদের ওপর মুহুর্মুহু ঢিল ছুড়ছেন। একপর্যায়ে ওই নারী কোল থেকে শিশুটিকে রেখে রামদা হাতে মানুষের দিকে তেড়ে যান। পরে আরেক লোক এসে ওই নারী ও শিশুকে সরিয়ে দেন। এরপর মুহূর্তেই ঘরটি ভেঙে শেষ করে দেন লোকজন। এভাবে দুটি ঘরে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়।

এর আগে এসব মানুষ সভা করেন এলাকার মোহাম্মদগঞ্জ বাজারে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দোলারবাজার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলাম। তিনি এলাকার চোর নির্মূল কমিটির সভাপতি। সভা পরিচালনা করেন বাজার কমিটির সভাপতি ও দক্ষিণ কুরশি গ্রামের বাসিন্দা মো. আলী হোসেন।

আলী হোসেন জানান, কুরশি গ্রামের দুটি পাড়া আছে। গ্রামের কিছু লোক দীর্ঘদিন ধরে চুরির সঙ্গে জড়িত। তাঁদের বিভিন্ন সময়ে এই পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এ জন্য নানাভাবে তাঁদের সহযোগিতাও করা হয়েছে। মাস দেড়েক আগে এলাকার আটজন চোরকে চিহ্নিত করে ‘তাঁরা আর চুরি করবেন না’ বলে মুচলেকা নেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। মঙ্গলবার রাতে উত্তর কুরশি গ্রামের দোলন মিয়ার বাড়িতে গরু চুরির সময়ে আটক করা হয় পাশের মইনপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামকে (২৫)। এ সময় তাঁদের সঙ্গে থাকা আরও তিনজন পালিয়ে যান।

আজ সকালে এ নিয়ে মোহাম্মদগঞ্জ বাজারে বৈঠকে বসেন এলাকাবাসী। বৈঠকে আটক সাইফুল স্বীকারোক্তি দেন তাঁর সঙ্গে মইনপুর গ্রামের আবু হানিফা, দক্ষিণ কুরশির আলী হোসেন ও তারেক মিয়া ছিলেন। বৈঠকে সবার মতামতের ভিত্তিতেই উত্তেজিত লোকজন দক্ষিণ কুরশির আলী হোসেন ও তারেক মিয়ার বাড়িতে গিয়ে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালান। দুটি ঘর একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে হামলা থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করা নারী তারেক মিয়ার স্ত্রী। তবে মানুষের ছোড়া ঢিলে তিনি কিংবা তার শিশুসন্তানের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। পরে এলাকায় থাকা জাহিদপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে পুলিশ গিয়ে ঘটনাস্থল ঘুরে আটক সাইফুল ইসলামকে নিয়ে আসে।

বৈঠকে কারও বাড়িঘরে হামলার সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন আলী হোসেন। তিনি বলেন, তাঁরা সকালেই একজন চোরকে আটক ও বৈঠকের বিষয়টি এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে জানান। তাঁদের কথা ছিল আটক ব্যক্তিকে পুলিশে দেওয়া হবে। কিন্তু হঠাৎ করেই কিছু তরুণ-যুবক উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। এরপর ওই ঘটনা ঘটে।

দোলারবাজার ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সকালে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। এ রকম অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা থেকে তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন।

স্থানীয় জাহিদপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুর রহমান বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল ঘুরে চুরির অভিযোগে আটক সাইফুলকে নিয়ে এসেছে। একটি চুরির মামলা হয়েছে। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের নামে থানায় একাধিক চুরির মামলা রয়েছে। বাড়িঘরে হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ তো এদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। অনেক চেষ্টা করেও এদের চুরি ছাড়ানো যায়নি। তবে কারও বাড়িঘরে হামলা করা ঠিক নয়। আমরা দেখে এসেছি। পরিস্থিতি এখন শান্ত আছে।’