
জান্নাতুল নাঈমা পেশায় স্বাস্থ্যকর্মী। চাকরির পাশাপাশি নিজের বাসাতেই আচার বানান তিনি। এরপর সেগুলো বিক্রি করেন। তাঁর এ আচারের খ্যাতি এখন উপজেলাজুড়েই। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এ আচার বিদেশেও যাচ্ছে।
ঘরের এক কোণে সারি সারি সাজানো আচারের কৌটা। এক পাশে চুলায় হাঁড়িতে সেদ্ধ হচ্ছে কাঁচা আম। কিছুক্ষণ পরেই এতে মসলাসহ নানান উপাদান যোগ করলেন এক নারী। এরপর কাঠি দিয়ে ধীরে ধীরে নাড়িয়ে তৈরি করলেন আচার।
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সদর ইউনিয়নের সুফিয়া রোড এলাকায় সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায় এই চিত্র। আচার তৈরি করা ওই নারীর নাম জান্নাতুল নাঈমা (৩৮)। পেশায় তিনি স্বাস্থ্যকর্মী। চাকরির পাশাপাশি নিজের বাসাতেই আচার বানান তিনি। এরপর সেগুলো বিক্রি করেন। তাঁর এ আচারের খ্যাতি এখন উপজেলাজুড়েই। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এ আচার বিদেশেও যাচ্ছে।
নাঈমার আচারের গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। করোনা মহামারিতে অবসর সময়ে অনেকেই বিকল্প কিছু করার কথা ভাবছিলেন। নাঈমাও ব্যতিক্রম ছিলেন না। এ ভাবনা থেকেই তিনি আচার বানানো শুরু করেন। এরপর ফেসবুকে নিজের আইডিতে পোস্ট দিয়ে এসব আচার বিক্রির ঘোষণা দেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সফল উদ্যোক্তা।
স্বামী পল্লিচিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম ও দুই সন্তান নিয়ে নাঈমার সংসার। সম্প্রতি তিনি প্রথম আলোকে বলেন, করোনার সময়ে হঠাৎ পাওয়া অবসরই তাঁকে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস জুগিয়েছিল। পরিবার থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবং পরে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আচার তৈরি শুরু করেন। শুরুতে অনলাইনে অল্প পরিসরে বিক্রি হলেও এখন তাঁর আচারের চাহিদা বেড়েছে।
অবশ্য তাঁকে এ কাজে সাহায্য করেন পরিবারের সদস্যরা। নাঈমার স্বামী বাজার থেকে কাঁচামাল ও মসলা সংগ্রহে সহায়তা করেন। এরপর একজন সহকারী তাঁকে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করতে সহায়তা করেন। এরপর মসলা মিশিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধরনের আচার। তিনি মূলত বরই, তেঁতুল, জলপাই, আম, আমড়া, চালতা, আমলকী, রসুনসহ নানা মৌসুমি ফলের আচার তৈরি করেন।
‘নাঈমার আচার’ নামে একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে তাঁর। প্রথমে ওই পেজের মাধ্যমে অর্ডার নিলেও বর্তমানে তিনি সরাসরিও বিক্রি করেন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মেলাতেও তিনি অংশ নেন। অনেকেই তাঁর আচার সঙ্গে করে বিদেশে নিয়ে যান। তাঁর ইতালি, ইংল্যান্ড, কানাডা, সৌদি আরব, কাতার ও দুবাইয়ে ক্রেতা রয়েছে। তাঁদের পরিচিত কেউ ওই দেশে গেলে নাঈমার থেকে আচার সংগ্রহ করে নিয়ে যান।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। ইচ্ছা ও সাহস থাকলে নারীরা যে এগিয়ে যেতে পারেন, নাঈমা এরই উদাহরণ।সোমাইয়া আক্তার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মিরসরাই, চট্টগ্রাম
বর্তমানে বছরে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কেজি আচার উৎপাদন করছেন নাঈমা। এতে বছরে তাঁর আয় হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নিজে যেমন আচার খেতে পছন্দ করি, তেমনি তৈরি করতেও ভালো লাগে। করোনার সময়ের অবসর আমাকে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ করে দেয়। চাকরির পাশাপাশি বাড়তি পরিশ্রম করে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
অবশ্য নিজের কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন নাঈমা। তাঁর পণ্য মান যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হওয়ায় বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও পেয়েছে। এখন তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আচার তৈরির প্রশিক্ষণ দেন। উদ্যোক্তা হিসেবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একাধিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।
নাঈমার আচারের নিয়মিত ক্রেতা মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এমটি (ইপিআই) কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, ‘শুরু থেকেই আমি নাঈমার আচারের নিয়মিত গ্রাহক। ঘরে তৈরি হওয়ায় এর স্বাদ ও মান বাজারের আচারের চেয়ে ভালো। আমার সহকর্মীদের অনেকেই এখন তাঁর আচার কিনছেন।’
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, ‘নাঈমার আচার এখন উপজেলায় পরিচিত একটি পণ্য। বিভিন্ন মেলায় তাঁর স্টল থাকে। শুনেছি তাঁর আচার বিদেশেও যাচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। ইচ্ছা ও সাহস থাকলে নারীরা যে এগিয়ে যেতে পারেন, নাঈমা এরই উদাহরণ।’