
বরিশালে অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই ব্রয়লার মুরগি পালন করে সফল হয়েছেন একদল খামারি। এতে যেমন উৎপাদন ব্যয় কমেছে, তেমনি কমেছে মুরগির মৃত্যুহারও। ফলে আগের চেয়ে বেশি লাভের পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত মুরগির মাংস পাচ্ছেন ভোক্তারা। কেউ কেউ এখন সেই মাংস প্যাকেটজাত করে সরাসরি বাজারেও সরবরাহ করছেন।
বরিশাল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের কারিগরি সহায়তা ও তত্ত্বাবধানে সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের কর্ণকাঠি গ্রামে গড়ে উঠেছে এই অ্যান্টিবায়োটিক-মুক্ত ব্রয়লার উৎপাদনকারী ‘মডেল পোলট্রি ভিলেজ’।
জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ শুধু প্রান্তিক খামারিদের আর্থিকভাবে সবল করবে না, এটা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিহ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ।
এ উদ্যোগের আওতায় ভিন্ন ভিন্ন ফ্লক সাইজের (মুরগির দলের আকার) ১০ জন খামারিকে নির্বাচন করা হয়। তাঁদের মুরগির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, খামারের পরিচ্ছন্নতা, রোগ প্রতিরোধ ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমানোর বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি পোলট্রি পালনের জন্য নির্ধারিত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বায়োসিকিউরিটি নির্দেশিকা মেনে খামার পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হয়। এই নিয়মগুলো অনুসরণের ফলে খামারগুলোতে রোগের প্রকোপ কমেছে এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজনও অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিম খলিল প্রথম আলোকে বলেন, পোলট্রি খাত বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তুলবে। তিনি বলেন, এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নে মডেল পোলট্রি ভিলেজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ইমার্জেন্সি সেন্টার ফর ট্রান্সবাউন্ডারি অ্যানিমেল ডিজিজেসের (ইসিটিএডি) প্রশিক্ষণ মডেল অনুসরণ করে পরিচালিত এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে দেশের অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
বরিশাল সদর উপজেলার কর্ণকাঠি গ্রামের যুবক শাওন সরদার এই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। নিজ বাড়ির আঙিনায় ছোট একটি ঘর দিয়ে শুরু করা তাঁর খামারে এখন তিনটি শেডে প্রায় তিন হাজার ব্রয়লার মুরগি আছে। এতে তাঁর নিজের পাশাপাশি আরও তিনজনের কর্মসংস্থান হয়েছে।
গতকাল রোববার এই খামার ঘুরে দেখা গেল, পরিচ্ছন্ন ও খোলামেলা শেডে মুরগিগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করছে। শেডগুলোতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের সুবিধা রাখা হয়েছে।
মুরগিকে খাবার দিতে দিতে খামারি শাওন বলেন, ‘নিজেদের পরিবারের জন্য যেমন নিরাপদ খাবার চাই, তেমনি অন্যদের জন্যও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই আমাদের এ উদ্যোগে এগিয়ে আসা। আমি কয়েক মাস ধরেই অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া মুরগি পালন করছি। এতে আগের তুলনায় দ্বিগুণ লাভ হচ্ছে। এখন মুরগির মাংস প্যাকেটজাত করে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছি। আমার দেখাদেখি আশপাশের আরও পাঁচ-ছয়জন এ পদ্ধতিতে খামার শুরু করেছেন।’
শাওন বলেন, ‘আগে ব্রয়লার মুরগি খেতে কেমন জানি অনিরাপদ বোধ করতাম। কিন্তু এখন সেটা লাগে না। নির্দ্বিধায় ব্রয়লার মুরগি খাচ্ছি এবং অন্যদেরও খাওয়াচ্ছি।’
আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের আগে সংগৃহীত নমুনায় প্রায় সব পরীক্ষিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেই জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা প্রায় শতভাগ ছিল। কিন্তু প্রশিক্ষণ, বায়োসিকিউরিটি মেনে খামার পরিচালনা এবং চারটি ব্যাচ পালন শেষে দেখা গেছে, চতুর্থ ব্যাচে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। এটি প্রমাণ করে যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও তদারকি বাস্তবে ফল দিচ্ছে।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা জানান, পোলট্রি খাতের খামারে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। মুরগির খামারে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে মানুষের রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
জানতে চাইলে আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক মো. নূরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, পোলট্রি খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। এ উদ্যোগের মাধ্যমে খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও তদারকি করে দেখানো হয়েছে, সঠিক বায়োসিকিউরিটি ও পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থাপনায় অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াও নিরাপদ ও মানসম্মত ব্রয়লার উৎপাদন সম্ভব। এই উদ্যোগের ফলে জনস্বাস্থ্যের এই ঝুঁকি কমে যাবে।
মো. নূরুল আলম বলেন, মডেল পোলট্রি ভিলেজ শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি কার্যকর পথ। এই মডেল দেশের অন্য এলাকাতেও প্রয়োগ করা গেলে পুরো পোলট্রি খাতেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।