
গণমাধ্যমকে সুস্থভাবে কাজ করতে না দিলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না, আবার জবাবদিহি ছাড়া গণমাধ্যমও স্বাধীনতার চর্চা করতে পারে না।
আজ শনিবার দুপুরে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন।
জহির উদ্দিন স্বপন মনে করেন, একটা দেশে গণতন্ত্র চলতে পারে না, যদি সে দেশের স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকে। আর গণমাধ্যম স্বাধীনতার চর্চা করতে পারে না যদি জবাবদিহি না থাকে। তিনি বলেন, ‘আমরা সেই কারণেই জবাবদিহি নিশ্চিত করব এবং এভাবেই একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে আমরা সম্মিলিতভাবে উন্নতির দিকে নিয়ে যাব।’
সাংবাদিকদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জানান, তাঁর সরকার দেশে ভয়ভীতিমুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করবে। এই পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো সমস্যা, সংকট বা বিরোধ সাংবাদিকতার নিজস্ব কাঠামো ও নীতিমালার মধ্যেই সমাধান হওয়া প্রয়োজন। এর বাইরে অন্য কোনো প্রশাসনিক বা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক হস্তক্ষেপ হলে পেশাগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শনিবার দুপুরে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ আলোচনা সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন।
আলোচনা সভায় ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল এবং জাতি স্বাধীন মাতৃভূমি পেয়েছিল। মানুষের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন। কিন্তু ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে যে সরকার গঠিত হয়েছিল, তাদের সময়েই মানুষের মৌলিক অধিকারে বাধা সৃষ্টি হয়। সব রাজনৈতিক দল বন্ধ করে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়েছিল। সেই অগণতান্ত্রিক পরিবেশেরই কুফল ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি হলে সেই সম্ভাবনাও হারিয়ে যাবে। সরকার গঠনের আগে কী করা হবে, তা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমান দেশে প্রত্যাবর্তনের সময়ই ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ বলেছেন। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়া হবে।
নারীদের পিছিয়ে রেখে দেশ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এ কারণেই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই কার্ড বিতরণ শুরু করা যাবে। দেশে ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবার রয়েছে। প্রতিটি পরিবারে পর্যায়ক্রমে এই কার্ড পৌঁছাতে পারলে নারীরা পরিবারে আরও ক্ষমতায়িত হবেন।’
বক্তব্যে বেকার সমস্যা নিয়েও কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, বেকার সমস্যা সমাধান করতে না পারলে কোনো সমস্যারই সমাধান হবে না। প্রতিবছর শিক্ষিত বেকার উৎপাদন করবে যে রাষ্ট্র ও সমাজ, সেই ব্যর্থ সমাজ কখনোই উন্নত হতে পারবে না। তাই খুব দ্রুত পরিকল্পিতভাবে কর্মসংস্থানের ম্যাপিং তৈরি করতে হবে, যাতে প্রত্যেকটি শিক্ষত তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। এ জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকেও যুগোপযোগী করতে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রশাসন ও দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘গত ১৬ বছর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজেদের বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যাঁরা ব্যবহৃত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় হয়েছেন। যাঁরা অনিচ্ছায় হয়েছেন, তাঁদের সম্মান জানাই। কিন্তু যাঁরা ইচ্ছায় হয়েছেন, তাঁদের চিহ্নিত হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এই বিষয়টি স্পষ্ট ও পরিষ্কার করতে চাই যে প্রশাসনকে তাঁর স্বক্রিয়তা বজায় রাখতে হবে। আবার প্রশাসনকে যাতে কেউ ব্যবহার করতে চাইবে, তা থেকেও আমাদের (দলীয় নেতা) বিরত থাকতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান একেবারে পরিষ্কার।’
দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘আপনারা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন, ত্যাগ স্বীকার করে দলের নেতা হয়েছেন। আপনাদের মনে রাখতে হবে, একজন রাজনীতিবিদের কাছে আন্দোলন একটা পেশা হতে পারে না। একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সমাজ বাধ্য করে আন্দোলন করতে। তাই আন্দোলন করেছি, এটা কোনো বড় কৃতিত্ব হতে পারে না। আন্দোলন করতে বাধ্য করেছে একটি সমাজ, সেই সমাজের প্রতি মানুষের যে ঘৃণা, সেই ঘৃণা যেন আমাদের ঘাড়ে না বর্তায়। ভবিষ্যতে যেন সেই আন্দোলন আমাদের বিরুদ্ধেও না হয়, এটাই কিন্তু আমাদের আগামীর রাজনীতি। তাই পুরোনো চিন্তা মগজ থেকে বাদ দিন। কোনো ধরনের অরাজনৈতিক, অশোভন, গণবিরোধী বক্তব্য, চিন্তা, আচরণকে আমরা বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেব না।’
আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি মো. মঞ্জুর মোর্শেদ আলম, বরিশাল জেলার পুলিশ সুপার ফারজানা ইসলাম, সিভিল সার্জন এস এম মনজুর-এ-এলাহী প্রমুখ। পরে শহীদ দিবস উপলক্ষে চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন অতিথিরা।