
ভোলার চরফ্যাশনে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শনিবার রাত ১০টার দিকে শশীভূষণ থানাধীন রসুলপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কলেরহাট রাস্তার মাথায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম আবদুর রহিম (৪৫)। তিনি একসময় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁকে হত্যার আগের দিন তাঁর ছেলেকে পিটিয়ে আহত করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা এবারের জাতীয় নির্বাচনে ভোলা-৪ আসনে (মনপুরা ও চরফ্যাশন উপজেলা) জয়ী বিএনপির প্রার্থী নুরুল ইসলামের (নয়ন) অনুসারী বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নিহত আবদুর রহিম রসুলপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আখতারুজ্জামানের ছেলে। তিনি ওই ওয়ার্ডের যুবলীগের আহ্বায়ক। প্রথম আলোকে তাঁর সাংগঠনিক পরিচয় নিশ্চিত করেছেন শশীভূষণ থানা যুবলীগের আহ্বায়ক মো. ফারুক হোসেন। তবে তিনি আবদুর রহিমের হত্যার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আবদুর রহিম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কাশেম।
বাড়ির উত্তরে আসার পর সন্ত্রাসীরা আমার বাবার ডান ও বাঁ কাঁধ বরাবর গলায় দুটি এবং মাথায় কপাল বরাবর আরেকটি কোপ দেয়। বাবা আল্লাগো বলে চিৎকার দেয়। আমরা সবাই দৌড়ে এসেছি বাড়ি থেকে। আইসা দেখি বিল্লাল হোসেন নতুন রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছে।বিবি রহিমা, নিহত আবদুর রহমানের মেয়ে
পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানা যায়, নিহত আবদুর রহিমের পরিবারের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁরা সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা নাজিম উদ্দিনের (আলম) অনুসারী। কিন্তু ভোলা-৪ আসনে এবারের নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন চেয়েও পাননি। বিএনপির প্রার্থী হয়ে আসনটিতে জয় পেয়েছেন নুরুল ইসলাম। স্থানীয় বিএনপিতে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।
আবদুর রহিমের ভাই মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বাড়ির সবাই বিএনপির অনুসারী। আমার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে আমার ছোট ভাই আবদুর রহিম আওয়ামী লীগকে পছন্দ করত, কিন্তু সক্রিয় না। সে মাটি কাটার কাজ করে, গাইগিরস্থি করে আর ছাগল পালন করত।’
স্থানীয় ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের আগের দুই রাতে জোর করে আবদুর রহিমের দুটি খাসি জবাই করে খেয়ে ফেলেন আমজাদ হোসেন, বিল্লাল হোসেন, সম্রাটসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন। তাঁরা ভোলা-৪ (চরফ্যাশন ও মনপুরা) আসনের বিএনপির প্রার্থী নুরুল ইসলামের (নয়ন) অনুসারী হিসেবে পরিচিত। খাসি খাওয়ার প্রতিবাদ করলে প্রথমে আবদুর রহিমের ছেলে আমির হোসেনকে গত শুক্রবার রাতে পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। তাঁর মুখের হাড় ও চোয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন। ছেলেকে নিয়ে বর্তমানে ঢাকায় আছেন আমির হোসেনের স্ত্রী। এ ঘটনায় গতকাল আবদুর ‘ছাগলখেকোদের’ গালাগাল করলে রাতের বেলা তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বলে দাবি স্বজনদের।
আবদুর রহিমের মেয়ে বিবি রহিমা সাংবাদিকদের জানান, গতকাল রাতে তাঁর বাবা কলঘাটা রাস্তার মাথার দোকানে চা পান করতে যান। চা পান করে ১০টার দিকে ফিরছিলেন। এ সময় তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বিবি রহিমা বলেন, ‘বাড়ির উত্তরে আসার পর সন্ত্রাসীরা আমার বাবার ডান ও বাঁ কাঁধ বরাবর গলায় দুটি এবং মাথায় কপাল বরাবর আরেকটি কোপ দেয়। বাবা আল্লাগো বলে চিৎকার দেয়। আমরা সবাই দৌড়ে এসেছি বাড়ি থেকে। আইসা দেখি বিল্লাল হোসেন নতুন রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছে। আমার বাবাকে রাস্তার কিনারে কচুরিপানার মধ্যে ফেলে চলে যাচ্ছে। আমি গায়ের ওড়না দিয়ে বাবার গলা পেঁচিয়ে চিৎকার করতে থাকি, আমার বাবারে উদ্ধার করেন, আমার বাবারে হাসপাতাল নিতে হবে। কেউ আসেনি। পরে আমার চাচাতো ভাইবোনেরা মিলে উদ্ধার করে চরফ্যাশন হাসপাতালে নিলে ডাক্তার বলেন তিনি মারা গেছেন।’
বাবার হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার চেয়ে বিবি রহিমা আরও বলেন, ‘আমার বাবাকে যারা খুন করেছে, আমরাও তাদের ফাঁসি চাই। আমার বাবার খুনি আমজাদ হোসেন, বিল্লাল হোসেন ও সম্রাট। ওরা মাদক ব্যবসায়ী। আমার বাবা মাদক খায়, কিন্তু মাদক ব্যবসা করে না।’
তবে এ হত্যাকাণ্ডে কোনো রাজনৈতিক যোগসাজশ নেই বলে দাবি বিএনপি নেতাদের। তাঁদের দাবি, মাদক ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। চরফ্যাশন উপজেলা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক কামাল গোলজার প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপি আওয়ামী লীগের কোনো যোগসাজশ নেই। এ হত্যাকাণ্ড মাদক বিক্রি নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে হয়েছে, অন্য কিছু নয়।
শশীভূষণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম জানান, নিহত আবদুর রহিম একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। খাসি খাওয়া ও মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের লোকজন লাশ দাফন করে মামলার প্রস্তুতি নেবেন।