
‘ওই ঘরেই আলাদা কক্ষে আমার বৃদ্ধ মা শুয়েছিল। বাচ্চাদের কান্না শুনে আমার মা ঘুম থেকে জেগে ঘরের দরজা খুলে দেন। গিয়ে দেখি দুই সন্তানকেই কুপিয়েছে আকলিমা। আকলিমা কীভাবে এটা পারল? নিজের সন্তানকে কি কেউ মেরে ফেলতে পারে?
কথাগুলো বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত শিশু মো. আশরাফুল ইসলামের বাবা শাহীন মিয়া। আশরাফুলকে (৩ বছর ৪ মাস) ছুরিকাঘাত করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার মা আকলিমা বেগমের (৩২) বিরুদ্ধে।
ছুরিকাঘাতে আশরাফুলের সৎবোন সিদরাতুল মুনতাহাও (৭) গুরুতর আহত হয়েছে। তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে সখীপুর উপজেলার বড়চওনা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মুজিবনগর মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ আকলিমাকে আটক করেছে।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে শাহীন মিয়া (৫০) নাসিমা আক্তারকে বিয়ে করেন। তাঁদের কোনো সন্তান না হওয়ায় নাসিমার সম্মতিতে প্রায় পাঁচ বছর আগে আকলিমাকে বিয়ে করেন শাহীন। আকলিমার আগের ঘরের মেয়ে সিদরাতুল মুনতাহাকেও তিনি নিজের সংসারে নিয়ে আসেন। বিয়ের প্রায় এক বছর পর আকলিমার ঘরে আশরাফুলের জন্ম হয়।
আশরাফুলের বয়স যখন প্রায় এক বছর, তখন আকলিমা ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। চাকরির কারণে মুনতাহা ও আশরাফুলকে বাড়ি রেখে যান তিনি। বড় মা নাসিমার কাছেই দুই সন্তান বড় হতে থাকে। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, আশরাফুল নাসিমাকে ‘মা’ বলে ডাকত।
তিন দিন আগে পোশাক কারখানা থেকে সাত দিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসেন আকলিমা। রাতে আশরাফুল বড় মায়ের সঙ্গে থাকতে চাইলে এ নিয়ে নাসিমা ও আকলিমার মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে আশরাফুল আকলিমার ঘরেই ছিল। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘুম থেকে উঠে সে বড় মায়ের ঘরে যেতে চায়। এ সময় আকলিমা ক্ষিপ্ত হয়ে আশরাফুল ও মুনতাহাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকেন বলে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য।
আশরাফুলের বাবা শাহীন মিয়া আজ বৃহস্পতিবার বেলা দুইটার দিকে থানায় বসে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত রাত ১০টার দিকে আমি বাড়িতে আসি। আশরাফুলের ঠান্ডা–কাশি ছিল। শ্বাস নিতে পারছিল না। গ্যাস দেওয়ার মেশিন আগেই বাড়িতে কেনা ছিল। পরে আমি তাকে গ্যাস দিই।’
শাহীন মিয়া বলেন, ‘আনুমানিক রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওর মা আকলিমা আলাদা ঘরে আশরাফুলকে নিয়ে ঘুমাতে যায়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ছেলে ও মেয়ের কান্না শুনি। ওই ঘরেই আলাদা কক্ষে আমার বৃদ্ধ মা শুয়েছিল। বাচ্চাদের কান্না শুনে আমার মা ঘুম থেকে জেগে ঘরের দরজা খুলে দেন। গিয়ে দেখি দুই সন্তানকেই কুপিয়েছে আকলিমা।’
পরে বাড়ির লোকজন ওই ঘরে গিয়ে আকলিমাকে আটক করেন। পরে তাঁকে বাড়ির উঠানে বেঁধে রেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ গিয়ে তাঁকে থানায় নিয়ে যায়।
স্থানীয় লোকজন আহত দুই শিশুকে প্রথমে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আশরাফুলকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে গুরুতর আহত মুনতাহাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সখীপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহিনুর রহমানের ভাষ্য, দুই সন্তানকে ছুরি দিয়ে আঘাত করার পর আকলিমা নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাঁর বাঁ হাতে ছুরির আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
নিহত আশরাফুলের বাবা শাহীন মিয়া বাদী হয়ে এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান সখীপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আজহারুল ইসলাম।