সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এর আগেই মহিষগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন এক রাখাল। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরের মেলাগড়ে
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এর আগেই মহিষগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন এক রাখাল। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরের মেলাগড়ে

হাওরের পাড়ে রাখালদের পাঁচ মাসের সংসার, সবুজ প্রান্তরে চড়ে বেড়ায় শত শত মহিষ

মেলাগড়ে পৌঁছেই মনে হয়—অচেনা কোনো সবুজ ভূখণ্ডে এসে পড়েছি। অথচ এটি দূরদেশ নয়, বাড়ির কাছেই এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর। মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরের একটি অংশ এই মেলাগড়। শীত নামলে হাওরের পানি সরে যায়, ভেসে ওঠে জলভেজা এই বিস্তৃত মাঠ। সেই মাঠ ক্রমে হয়ে ওঠে আরও সবুজ ও মায়াবী।

সম্প্রতি এক বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শান্ত প্রকৃতির সহাবস্থানে অল্পকিছু মানুষ, শত শত মহিষ আর সাদা বকের ঝাঁক। চারদিকে কেবল ঘাসের বিস্তার। কোথাও কাদামাটি, কোথাও ফেটে যাওয়া জমি—তবু সবখানেই সবুজের দখল।

স্থানটিতে তখন অনেকগুলো মহিষ। সবুজ ঘাসের দেশে মহিষগুলো ইচ্ছেমতো ঘুরছে, ঘাস খুঁটে খাচ্ছে। একটা সময় হাওরপারের এলাকাগুলোয় প্রচুর মহিষ দেখা গেছে। হালচাষে মহিষই তখন কৃষকের অন্যতম অবলম্বন ছিল, ভরসা ছিল।

ছোট-মাঝারি কৃষকের পক্ষে মহিষ লালন-পালন করে চাষাবাদ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে মহিষ দিয়ে চাষের পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি বিলোপ হয়নি। বিক্ষিপ্তভাবে দু–এক জায়গায় এখনো জমিতে মহিষ দিয়ে হাল চাষ চোখে পড়ে।

রাখালদের থাকার অস্থায়ী আবাস ‘উরা’

প্রতি শুষ্ক মৌসুমে পাঁচ-ছয় মাসের জন্য রাখালেরা এখানে অস্থায়ী ‘উরা’ বেঁধে থাকেন। পরিবার থেকে দূরে কাটে দিন–রাত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চরানো, রাতে বেঁধে রাখা—এই তাঁদের জীবনচক্র। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে পানি ফিরলে তাঁরাও ফিরে যান ঘরে।

রাজনগরের কাশিপুরের আখলিছ মিয়া এমনই একজন রাখাল। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ২৬টি মহিষ নিয়ে এখানে এসেছেন। কোরবানির ঈদে বিক্রির লক্ষ্যেই বেশির ভাগ মহিষ কেনা। আরও দুজন সহকর্মী নিয়ে তিনি থাকছেন উরায়। পাশেই আরেকজনের আছে ৪৫টি মহিষ। একই সঙ্গে তাঁরা মহিষগুলো রাখেন, হাওরে চরিয়ে বেড়ান।

মহিষের অবাধ্য ছানাটিকে খুঁটিতে বাঁধার চেষ্টা করছে এক রাখাল

কয়েকজন রাখাল বললেন, তাঁরা নিজেরাই বিভিন্ন বিল থেকে মাছ কিনে আনেন, রান্নাবান্না করেন। সকালবেলা খুঁটি থেকে মহিষগুলোর গলার দড়ি খুলে দেন। এরপর সেগুলো বিশাল মাঠে ঘুরে ঘুরে ঘাস খুঁটে খায়। আশপাশের ধানের খেতে যাতে ছুটে না যায়—তা খেয়াল রাখতে তাঁরা মহিষের পিছু নেন। সন্ধ্যা হলে মহিষগুলোকে উরার কাছে নির্দিষ্ট স্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন, এরপর বেঁধে রাখেন। এখানে চোরছ্যাচড়ের উপদ্রব নেই। সৌরবিদ্যুতের আলোতেই তাদের রাত্রযাপন চলে।

কিছু দূরে আরেক উরায় সাতজন রাখাল মিলে দেখাশোনা করছেন প্রায় সাড়ে ৩০০ মহিষ। রাজনগরের আমিরপুরের ফরহাদ মিয়া (৭৭) জানান, অগ্রহায়ণ থেকে জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত তাঁরা এখানে থাকেন। মালিকেরা প্রতি মহিষের জন্য মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দেন। অসুখ-বিসুখের খরচ রাখালদের, তবে গাভির দুধ তাঁদেরই প্রাপ্য।

হাওরের খোলা প্রান্তরে সারা দিন চরে বেড়ায় মহিষের দল

রাখালদের কথা শুনতে শুনতে তখন বেলা প্রায় পড়ে এসেছে। মহিষগুলো দূর থেকে সবুজ গালিচা ধরে উরার দিকে ফিরছে। এ জন্য প্রাণীগুলোকে খুব একটা শাসনের প্রয়োজন পড়ছে না। বিচ্ছিন্নভাবে একটা-দুটো আলাদা হয়ে ঘাস খুঁটে খায়। তবে সেগুলোও ডেরায় ফেরে কিছুক্ষণের মধ্যেই। পরে মাটিতে পুঁতে রাখা খুঁটির সঙ্গে মহিষগুলোকে বেঁধে রাখেন রাখালেরা।