মুঠোফোনে পদ্মায় বাসডুবিতে মৃত লিমা আক্তারের ছবি দেখাচ্ছেন বাবা সোবহান মণ্ডল। পাশে পরিবারের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার দুপুরে সদর উপজেলার মিজানপুর ইউপির রামচন্দ্রপুর গ্রামে
মুঠোফোনে পদ্মায় বাসডুবিতে মৃত লিমা আক্তারের ছবি দেখাচ্ছেন বাবা সোবহান মণ্ডল। পাশে পরিবারের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার দুপুরে সদর উপজেলার মিজানপুর ইউপির রামচন্দ্রপুর গ্রামে

পদ্মায় বাসডুবি : লিমার মৃত্যুতে অসহায় পরিবার, থেমে গেল সব স্বপ্ন

লিমা আক্তার (২৬) রাজবাড়ী সরকারি কলেজে স্নাতক (পাস) শেষ বর্ষে পড়তেন। পাশাপাশি তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন; প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বিদেশ যাওয়ার। শিক্ষার্থী হয়েও তিনি পরিবারে আর্থিক সহায়তা করার চেষ্টা করতেন। দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় লিমার মৃত্যুতে তাঁর পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে।

লিমার বাড়ি রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামে; বাবার নাম সোবহান মোল্লা। তিন ভাই–বোনের মধ্যে লিমা দ্বিতীয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে রামচন্দ্রপুর গ্রামে গিয়ে কথা হয় লিমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, লিমা সব সময় পরিবারের সদস্যদের হাসিখুশিতে ভরিয়ে রাখতেন, তাঁকে হারিয়ে তাঁরা শোকে স্তব্ধ।

সোবহান মোল্লা দরিদ্র কৃষক। তাঁর বড় মেয়ে সিমা আক্তারের কয়েক বছর আগে বিয়ে হয়েছে। তাঁর স্বামী সৌদি আরবে থাকেন। দুই সন্তান নিয়ে সিমা বাবার বাড়িতেই থাকেন। স্ত্রী, দুই মেয়ে, নাতি ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সোবহান মোল্লার সংসার।

গত ২৫ মার্চ বিকেলে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটের সামনে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাসডুবির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে রাজবাড়ী জেলার ১২টি পরিবারের ১৮ জন ছিলেন।

লিমা আক্তার

দুর্ঘটনার দিনের (২৫ মার্চ) বর্ণনা দিতে গিয়ে সিমা আক্তার বলেন, ‘ঈদের ছুটি শেষ হওয়ায় লিমা ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তিন দিন আগে লিমা অনলাইনে বাসের টিকিট কাটে। দুপুরে আমরা সবাই একত্রে খাওয়া–দাওয়া করি। বেলা তিনটার দিকে রাজবাড়ী শহর পর্যন্ত গিয়ে ওকে আগায় দিয়ে আসি। এ সময় লিমা শুধু বলে, “আপু, তুই সবাইকে দেখে রাখিস। অমিতকে দেখে রাখিস। আমি ঢাকায় পৌঁছে ফোন করে জানাব।” এই ছিল আমার সঙ্গে ওর শেষ কথা। বাড়ি ফিরে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ছয়টার দিকে উঠে দেখি লিমা ৫টা ৪ মিনিটের দিকে ফোন করেছিল। কী বলতে চেয়েছিল জানি না। ওই সময় ফোন করে দেখি ওর ফোন বন্ধ। এরপরই টেলিভিশনে দেখতে পাই পদ্মায় বাসডুবির খবর।’

লিমার বাবা সোবহান মোল্লা বলেন, ‘বাসডুবির খবর পেয়ে আমি দ্রুত ছুটে যাই নতুন বাজার মুরগির ফার্ম বাস কাউন্টারে। এ সময় কাউন্টার থেকে জানানো হয়, তিনটার দিকে সৌহার্দ্য পরিবহনের যে বাসটি এখান থেকে ছেড়ে গেছে, ওই বাসটি পদ্মা নদীতে ডুবে গেছে। তখন আমার হাত-পা চলা যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি কোনোভাবে বাড়ি এসে জানাই। এ সময় ছেলে অমিতসহ ভাতিজারা সবাই মিলে ছুটে যায় দৌলতদিয়া ঘাটে। পরদিন সকালে লাশ নিয়ে আসে বাড়িতে। বাড়ির অদূরে রামচন্দ্রপুর কবরস্থানে দাফন করি। ওর দাফনের মধ্য দিয়ে আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’

আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় লিমার ছোট ভাই অমিত মোল্লা এইচএসসি পাসের পর চাকরিতে ঢোকেন। তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতেন লিমা। অমিত বলেন, ‘বাবা দরিদ্র কৃষক। আমি রাজবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকায় চলে যাই। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে ঢুকি। ঈদের কয়েক মাস আগে অসুস্থ হওয়ায় বাড়ি ফিরে আসি।  আপু বলেছিল, “তুই চিন্তা করিস না, আমি তোর জন্য আছি। তোকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব আমার। তোকে প্রতিষ্ঠিত করার পর বিয়ে দিব, অনেক বড় অনুষ্ঠান করব।”’

অমিত আরও বলেন, ‘লিমা আপু জাপান যাওয়ার জন্য ঢাকায় বিশেষ কোর্স করছিলেন। কোর্স প্রায় শেষের দিকে। এ বছরই তাঁর জাপান যাওয়ার কথা। আমরা তাঁকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্ন ছিল আমিও বিদেশে যাব। লিমা আপুর বিয়ের কথাও চলছিল। অনেকে এসে তাঁকে দেখে গেছেন। কিন্তু আমাদের সব স্বপ্ন যেন নিমেষেই শেষ হয়ে গেছে।’