নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। গতকাল সন্ধ্যায় নোয়াপাড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে
নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। গতকাল সন্ধ্যায় নোয়াপাড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে

চট্টগ্রাম-৬ আসন

সন্ত্রাস, খুনোখুনি বন্ধ হবে কি, প্রশ্ন ভোটারদের

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে লাম্বুরহাট বাজারের অবস্থান। উপজেলার দক্ষিণে বাগোয়ান ইউনিয়নের এ বাজার ২০০ বছরের বেশি পুরোনো। বাজারে কয়েক শ দোকানে দিনভর চলে বেচাকেনা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভিড়ে গমগম করে বাজার এলাকা। চা-দোকানগুলোতেও ভিড় লেগেই থাকে। তরিতরকারি, চাল, ডালসহ নিত্যপণ্য, মনোহারি দোকানগুলো ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে ভরে ওঠে।

বাজারের এক প্রান্তে নদীর প্রায় তীর ঘেঁষে একটি মুদির দোকান। দোকানের মালিক মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন স্থানীয় একটি কলেজে পড়ান। পাশাপাশি এই ব্যবসাও করেন। ক্রেতাদের সামলানোর ফাঁকে ফাঁকে ভোট নিয়ে কথা বলছিলেন তিনি। প্রসঙ্গ উঠতেই বলেন, ‘ভোট নিয়ে একটা আশঙ্কা তো আছেই। কিন্তু কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা বসবে বলে শুনেছি। গোলমাল না হলে মানুষ ভোট দিতে যাবে।’

কথায় কথায় জামাল উদ্দিন জানান, রাউজানের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে মানুষ আতঙ্কে আছেন। যে প্রার্থী পরিস্থিতির উন্নতির করতে পারবেন বলে ভোটাররা মনে করেন, ভোট তাঁর বাক্সেই যাবে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের ভোটারদের মূল ভাবনাটাই তুলে ধরলেন এই কলেজশিক্ষক। এখানকার মানুষের বড় চিন্তা খুনোখুনি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি নিয়ে। নতুন সরকার নির্বাচিত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটুকু উন্নতি হবে, তা নিয়েই ভাবনা মানুষের। জীবন নিরাপত্তা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে এই উপজেলার মানুষের অতীত অভিজ্ঞতাও তিক্ত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত ১৮ মাসে রাউজানে ২০টি খুন, শতাধিকবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। নিরাপদে কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন কি না, এ নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে ভোটারদের মধ্যে।

জীবন নিরাপত্তা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে এই উপজেলার মানুষের অতীত অভিজ্ঞতাও তিক্ত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত ১৮ মাসে রাউজানে ২০টি খুন, শতাধিকবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। নিরাপদে কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন কি না, এ নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে ভোটারদের মধ্যে।

রাউজানের ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের ভোটারদের কাছে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বড় ইস্যু। এরপর আছে যোগাযোগব্যবস্থা। উপজেলার বেশির ভাগ গ্রামীণ সড়ক দিয়ে চলাচল করা দুষ্কর। শতাধিক গ্রামের সড়কে বর্ষা মৌসুমে বন্ধ থাকে যান চলাচল। হালদা ও কর্ণফুলীর তীরবর্তী গ্রামগুলোর অবস্থা আরও বেশি খারাপ।

গতকাল রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাউজানের বিভিন্ন জনপদে ঘুরে ভোটারদের মনের কথা জানতে চেয়েছি। উপজেলার দক্ষিণাংশের বাগোয়ান ইউনিয়নের কর্ণফুলী নদীর তীরের লাম্বুরহাট থেকে যাত্রা করে উত্তরাংশের ফটিকছড়ি সীমান্তের হলদিয়ার উত্তর সর্তা গ্রাম পর্যন্ত ভোট নিয়ে কথা হয়েছে নানা শ্রেণি-পেশার শতাধিক মানুষের সঙ্গে। তাঁদের প্রায় সবাই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন আর অপহরণের মতো অপরাধকে উপজেলার প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

রাউজানের মানুষের প্রধান সমস্যা সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজি এবং যোগাযোগব্যবস্থার দুর্ভোগ। আমরা এমন একজন সংসদ সদস্য চাই, যাঁর কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী থাকবে না।
-আলী সিদ্দিকী, মুদি দোকানি, আমিরহাট।

উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির ধানের শীষের ব্যানার চোখে পড়েছে। আছে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা, ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতির ব্যানারও। কম হলেও গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল প্রতীকের ব্যানারও ঝুলতে দেখা গেছে। ভোটের আমেজ থাকলেও চাপা একটা আশঙ্কাও আছে মানুষের মনে। তবে সব ঠিক থাকলে ভোটকেন্দ্রে যাবেন বলে জানিয়েছেন বেশির ভাগ ভোটার।

লাম্বুরহাটের সবজি বিক্রি করেন আনিসুর রহমানের মনে ভোট নিয়ে আশঙ্কা আছে। বাজারের এক কোণে সবজি নিয়ে বসেন তিনি। ভোটের প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, ‘সরকার বা মন্ত্রী-এমপিরা তো আমাদের আর ভাত খাওয়াবে না, কাপড়ও দেবে না। আমরা তাঁদের কাছে কী চাইব। চাওয়ার আছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জীবনের নিরাপত্তা আর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি। এখনো মাঝেমধ্যে রাতে গুলির শব্দ পাই। আতঙ্কে জেগে উঠি। এ পরিস্থিতি ভোটের পর থাকুক, আমরা চাই না। পরিস্থিতি ঠিক থাকলে অবশ্যই ভোট দিতে যাব।’

ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী ইলিয়াছ নূরীর গণসংযোগ। গতকাল দুপুরে পৌরসভার চত্তরপাড়া এলাকয়

উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের বড় বাজার আমিরহাট। সেখানকার পাইকারি ও খুচরা মুদি ব্যবসায়ী আলী সিদ্দিকীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁরও চাওয়া, রাউজান সন্ত্রাসমুক্ত হোক। তিনি বলেন, ‘রাউজানের মানুষের প্রধান সমস্যা সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজি এবং যোগাযোগব্যবস্থার দুর্ভোগ। আমরা এমন একজন সংসদ সদস্য চাই, যাঁর কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী থাকবে না।’

এ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী ইলিয়াছ নুরী, জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী শাহাজাহান মঞ্জু, গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল প্রতীকের প্রার্থী নাসির উদ্দিন তালুকদার ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। চার দলের চারজন প্রার্থীই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত শান্তির রাউজানের। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটারদের আস্থা যিনি জয় করতে পারবেন, তিনিই জয় পাবেন।

নোয়াপাড়া এলাকায় কলেজশিক্ষার্থী আফরোজা জাহান এবার প্রথম ভোট দেবেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা এবার এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চাই, যিনি মানুষের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দেবেন।’

রাউজানে দীর্ঘদিন ধরে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে। এখানকার মানুষজন রাজনীতি নিয়ে নিজস্ব মতামত দিতে অনেক চিন্তাভাবনা করেন। বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ বেলালের আশা এবার সেই ভয়ের সংস্কৃতির অবসান হবে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নিরাপদ রাউজান চাই। আতঙ্কমুক্ত, ভয়ের সংস্কৃতি দূর করে যিনি জনবান্ধব উপজেলা গড়বেন, তাঁকে ভোট দিতে চাই।’

উপজেলার কচুখাইন এলাকায় খেতে কাজ করছিলেন ৬০ বছর বয়সী কৃষক মুহাম্মদ ইসমাইল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার আসে যায়, কিন্তু আমাদের কোনো উপকার হয় না। কতবার যে ঋণের আবেদন করলাম, কিন্তু পাইনি। এবার তাই যাঁরা কৃষকের পাশে থাকবেন, তাঁদেরই ভোট দেব।’

রাউজান উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা পরান্টু চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, এ উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৬ আসন একটি বড় নির্বাচনী এলাকা। এ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ৯৫টি এবং ভোটকক্ষ রয়েছে ৬৩৯টি। মোট ভোটার ৩ লাখ ৭১ হাজার ৯৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৭১ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৬১ হাজার ১৭ জন।