‘সুখী হইতে সততা লাগে, আর লাগে তৃপ্তি’

সুখী মানুষের একগাল হাসি রমিজ আলীর
ছবি: প্রথম আলো

ভাদ্রের তালপাকা গরমেও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার প্রাচীন কাইকার টেক হাটে মানুষের কমতি নেই। দূরদূরান্ত থেকে কেউ হাটে এসে পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন। কেউবা হাট ঘুরে পছন্দের পণ্য কিনছেন। অনেকে আবার এসেছেন পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের কোলে গড়ে ওঠা প্রাচীন গ্রামীণ হাটের সৌন্দর্য দেখতে। হাটে আসা সেসব মানুষের একজন বৃদ্ধ রমিজ আলী।

গত রোববার রমিজ আলীর সঙ্গে দেখা, হাটের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে ঝাঁকিজাল বিক্রির দোকানে। পরনে কালো সুতার কাজ করা সাদা পাঞ্জাবি। মাথায় বাঁশ ও শালপাতার তৈরি মাথাল। বৃদ্ধের ছবি তুলতে চাইলে দাঁতের পাটি বের করে একরাশ হাসেন। ছবি দেখতে চান। সেই সূত্রেই আড্ডা জমে। ‘ছোটকালে বাপের লগে হাটে আসতাম, এখন একা আসি।’ শিশুদের মতো সরল হাসি নিয়ে কথা বলেন। বয়স জানতে চাইলে উত্তর দেন, ‘সিক্সটি ফাইভ।’

রমিজ আলীর তিন ছেলে, এক মেয়ে। সবারই সংসার হয়েছে। নাতি-নাতনি নিয়ে বন্দর উপজেলার চৌধুরী বাড়ি এলাকায় নিজের বাড়িতে থাকেন। ছেলেরা প্রবাসী। সম্প্রতি দুই ছেলে ছুটিতে দেশে ফিরেছেন। বহুদিন পর দেশে ফেরা বড় ছেলের ইচ্ছা জেগেছে বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় ধনেপাতা আর মুলাশাক চাষ করবেন। ছেলের আবদার মেটাতেই হাটে আসা। উদ্দেশ্য শাকসবজির বীজ কিনবেন। বীজের দোকানে যাওয়ার পথে ঝাঁকিজাল দেখে কেনার শখ হয়েছে। জালের দোকানে সুতার বুনন দেখছিলেন। বীজ কিনতে এসে জালের দোকানে কেন জানতে চাইলে রমিজ আলী বলেন, বাড়ির পাশে তাঁর ছোট্ট পুকুর আছে। স্ত্রী মেহেরনারা মাছ শিকার দেখতে পছন্দ করেন। সে কারণেই জাল কিনতে আসা। সে কথা বলেই শিশুর মতো প্রাণ খুলে হাসেন।

এমন হাসির উৎস জানতে চাইলে রমিজ আলী জবাব দেন, ‘সুস্থ আছি। কোনো অভাব নেই। অভিযোগ নেই। অতৃপ্তি নেই। এমনিতেই হাসি আসে।’ প্রশ্ন করি, ‘অতৃপ্তি নেই বলছেন, জীবনে সবকিছুই কি পেয়েছেন?’ ভরা বাজারেই রমজান আলী গান ধরেন, ‘এ জীবনে যতটুকু চেয়েছি, মন বলে তারও বেশি পেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘খুব কষ্ট করে এই সুখ অর্জন করছি। জীবনে রিকশা চালাইছি, মাটির কাম করছি, মানুষের বোঝা টানছি। সৎ টেকাপয়সা দিয়া ছেলেগো আইএ পাস করাইছি। এই ছেলেরা এখন আমারে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। তাদের সংসার হইছে কিন্তু আলাদা হয় নাই। ছেলেগো টেকায় বাড়িতে এখন দোতলা বিল্ডিং। ১২ শতক জায়গার ওপরে বাড়ি। এর বাইরে পুকুর। এখন এলাকার মসজিদে আজান দিই। অবসরে নাতি-নাতনিদের নিয়া খেলাধুলা করি। আমার মতো সুখী কয়জন আছে কন তো?’

কৃষক জয়নাল আবেদিনের ঘরে রমিজ আলীর জন্ম। চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে অভাবের সংসার। ভাই-বোনদের মধ্যে রমিজ আলী পড়াশোনায় ভালো। শিক্ষকেরা চাইলেও অভাবের সংসারে মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি। দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। অবসরে পাড়ায় ঘুরে ঘুরে গলা ছেড়ে গান ধরেন। মোহাম্মদ রাফি, গীতা দত্ত, কিশোর কুমার ফেরে তাঁর মুখে। সেই গানের সূত্রেই মেহেরনারের সঙ্গে প্রেম আর পরিণয়।

রমিজ আলী বলেন, ‘আপনের নানি আর আমরা একই এলাকার। ওনার চাচা আমারে পছন্দ করতেন সন্তানের মতো। তো বাড়িতে আইতাম-যাইতাম। ওইনেই দেখা হইত। চোখে চোখ পড়লে হাসি দিতাম। তখন মাথাভরা চুল ছিল। সুন্দর কইরা ঢেউ খেলাইয়া আঁছড়াইতাম। আর গান শোনাইতাম। আমার গান শুইনাই ওনি (মেহেরনার) পাগল হইছে। কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ি আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি না। গরিব ছিলাম।’ জীবনের সোনালি সময়ের কথা মনে করতে গিয়ে তিনি স্মৃতিকাতর হন। পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া ভাই, বোন, বাবা ও মায়ের কথা মনে করেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘একে একে আশপাশের সবাই ছাইড়া চইলা গেছে। আমি এখনো সুস্থ আছি, আপনার নানিও সুস্থ আছেন। এহনো তারে ওই পুরানা গান শোনাই।’

এ কথা বলেই মোহাম্মদ রাফির একটা গান ধরেন রমিজ আলী। মনে করিয়ে দেন স্ত্রী মেহেরনারের গান খুব পছন্দ। গান শেষ হতেই বাড়ি ফেরার তাড়া দেন। যাওয়ার আগে তাঁর কাছে জানতে চাই, জীবনে সুখী হতে কী লাগে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘বেশি কিছু লাগে না। ইমানে অটল থাকতে হয়, ইমানদার হইতে সততা লাগে। সুস্থ থাকতে হয়। আর লাগে তৃপ্তি। নিজের যা আছে, তা নিয়া আলহামদুলিল্লাহ কইতে পারলে আপনে সুখী।’