
রঙিন বেলুন হাতে বিভিন্ন বিপণিবিতানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন বৃদ্ধা আয়মনা বেগম (৬৫)। গাড়ি বা রিকশায় শিশু দেখলেই দৌড়ে যান বেলুন নিয়ে। রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন না। সামান্য হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠেন। কোমরের ব্যথায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়েও থাকতে পারেন না। একটু পরপর বসে বিশ্রাম নিতে হয়। দিন শেষে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার বেলুন বিক্রি করে ক্লান্ত শরীরে কুঁজো হয়ে বাড়ি ফেরেন।
শহরের জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, চৌহাট্টা ও আম্বরখানা এলাকায় বেলুন বিক্রি করেন আয়মনা বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নগরের বন্দরবাজার পাইকারি দোকান থেকে একসঙ্গে ৫০০ বেলুন কেনেন। বাসায় নিয়ে বাতাস ভরে পাঁচটি বেলুন একসঙ্গে বেঁধে ১০ টাকা করে বিক্রি করেন। বৃষ্টি হলে বিক্রি কম হয়। কোনো কোনো দিন বিক্রি ভালো হয়। তবে সামান্য আয়ে সংসার চলে না।
আয়মনা বেগমের জন্মস্থান নেত্রকোনার মদন উপজেলায়। এটুকু তথ্যই তাঁর জানা। এর বেশি কিছু মনে নেই। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জন্মের আগেই তাঁর বাবা মারা যান। সাত বছর বয়সে মাকে হারান। এরপর গ্রামের এক আত্মীয়ের সঙ্গে ১০ বছর বয়সী একমাত্র ভাই ও তিনি সিলেট শহরে আসেন। নগরের শেখঘাট এলাকার একটি বস্তিতে থাকতে শুরু করেন। এর কিছুদিন পর বড় ভাই তাঁকে একটি বাসায় কাজে রেখে চলে যান ঢাকায়। সেই থেকে তাঁর কষ্টের জীবন শুরু।
গত শুক্রবার রাতে নগরের জিন্দাবাজার মোড়ে আলাপ হয় আয়মনা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, কোনো কিছু বোঝার আগেই জীবনে যে দুঃখ শুরু হয়েছিল তাঁর, তা বহন করে চলছেন। সারা জীবন মানুষের বাসায় কাজ করেছেন। একসময় বিয়ে করে সংসারও পাতেন। স্বামী মারা গেছেন, সেটাও অনেক বছর হয়ে গেছে। এখন তাঁর বয়স হয়েছে। শরীরে বিভিন্ন রোগ বাসা বেঁধেছে। অন্যের বাসায় কাজ করতে পারেন না এখন আর। তাই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বেলুন বিক্রি করছেন।
জীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে সুখের নাগাল পাবেন—এই আশা ছিল আয়মনা বেগমের। তিনি বলেন, কাজ করে কিছু টাকাও জমিয়ে ছিলেন। বিয়ের পর এই টাকা দিয়ে স্বামীকে একটা রিকশা কিনে দেন। কিন্তু কপাল বদলায়নি। এক ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে স্বামী মারা যান। এরপর সন্তানদের নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে শুরু করেন। মানুষের বাসায় কাজ করে সন্তানদের বড় করে তোলেন।
আয়মনা বেগম এখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকেন নগরের শেখঘাট কলাপাড়া বস্তিতে। পরিবারে এখন সাতজন সদস্য।
তিনি বলেন, ছেলে বিয়ে করেছেন। তাঁর স্ত্রী ও এক সন্তান রয়েছে। দুই মেয়ের মধ্যে বড়টি শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তাঁর বিয়ে দিয়েছিলেন। একটা সন্তান রয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ায় সে-ও এখন সন্তান নিয়ে আয়মনা বেগমের সঙ্গে থাকেন। প্রতিবন্ধী হওয়ায় কোনো কাজ করতে পারেন না। টাকার অভাবে ছোট মেয়েকে বিয়ে দিতে পারছেন না।
আয়মনা বেগম আরও বলেন, ছেলে ফ্লাক্সে করে হেঁটে হেঁটে চা বিক্রি করেন। আর তিনি বেলুন বিক্রি করেন। দুজন মিলে যে টাকা পান, তা দিয়েই সংসার চালাতে হয়। তবে এ আয়ে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। প্রতি মাসে বাসাভাড়া বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়। টাকার অভাবে প্রায়ই মুদিদোকান থেকে পণ্য বাকিতে আনতে হয়। কোনো কোনো মাসে বাসাভাড়াও বাকি রাখতে হয়।