ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসবে বিজয়ীদের সঙ্গে অতিথিরা। গতকাল চট্টগ্রাম নগরের সেন্ট প্ল্যাসিডস স্কুল অ্যান্ড কলেজে
ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসবে বিজয়ীদের সঙ্গে অতিথিরা। গতকাল চট্টগ্রাম নগরের সেন্ট প্ল্যাসিডস স্কুল অ্যান্ড কলেজে

চট্টগ্রামে আঞ্চলিক গণিত উৎসব

গণিতে মাতল হাজারো শিক্ষার্থী 

‘পৃথিবী চাঁদকে টানে, চাঁদও পৃথিবীকে টানে। তবু চাঁদ কেন ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?’ খুদে শিক্ষার্থী জুনায়েদ হোসেনের এ প্রশ্নে মুহূর্তেই নড়েচড়ে বসে প্রশ্নোত্তর পর্ব। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম নগরের সেন্ট প্ল্যাসিডস স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক গণিত উৎসবে এমন কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নই যেন উৎসবকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।

‘গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো’ স্লোগান সামনে রেখে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গণিত উৎসবের আয়োজন করে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি। আয়োজনে সহযোগিতা করেছে প্রথম আলো চট্টগ্রাম বন্ধুসভা।

এ বছর দেশের ১২টি শহরে আঞ্চলিক গণিত উৎসব আয়োজিত হচ্ছে। অঞ্চলগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা ও কুষ্টিয়া। গতকালের অনুষ্ঠান মিলে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা ও সিরাজগঞ্জে গণিত উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কনকনে শীত উপেক্ষা করে সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হাজির হয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী। চট্টগ্রামের পাশাপাশি কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকেও শিক্ষার্থীরা অংশ নেয় উৎসবে।

সকাল সাড়ে নয়টায় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা ও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন সেন্ট প্ল্যাসিডস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রাদার স্যামুয়েল সবুজ বালা ও ব্রাদার সনেট ফ্রান্সিস রোজারিও। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস এম নছরুল কদির ও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপক রঞ্জন বড়ুয়া। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সভাপতি রুমিলা বড়ুয়া।

মুখর প্রাঙ্গণ

সকাল আটটার আগেই শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছিলেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরাও। কক্সবাজারের বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী শায়ান আহমেদ উৎসবে অংশ নিতে আগের দিনই পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রামে আসে। শায়ান বলে, ‘গণিত আমার খুব প্রিয়। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে।’

নগরের আগ্রাবাদ থেকে এসেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরিয়ান আরাফ। আগেও গণিত উৎসবে অংশ নিয়েছিল সে। আরিয়ানের কাছে প্রশ্নোত্তর পর্বটাই সবচেয়ে উপভোগ্য।

ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে সারা জাফরিন সকাল নয়টার আগেই উৎসব প্রাঙ্গণে হাজির হয়। সে জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবার উত্তীর্ণ হতে চায়।

প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মোস্তফা আবরার চাচা ও ভাইয়ের হাত ধরে আসে উৎসবে। জাতীয় সংগীতে অংশ নিতে সে দাঁড়ায় সামনের সারিতে। একফাঁকে জানায়, যোগ-বিয়োগ, গুণ আর ভাগ তার কাছে খুবই সহজ।

উৎসব ঘিরে বই ও শিক্ষাসামগ্রীর বিভিন্ন স্টল বসে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা স্টল ঘুরে দেখেন, কেনেন গণিত আর ধাঁধার বই।

‘গণিতের ভয় কাটাতে হবে’

উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক এস এম নছরুল কদির বলেন, ‘এ উৎসব শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি স্বপ্ন দেখার একটি মঞ্চ। গণিত কঠিন মনে হতে পারে, ভয়ও লাগতে পারে। কিন্তু ভয়কে জয় করলেই সামনে এগোনো যায়।’ তিনি বলেন, গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী দেশে-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছে। এখান থেকেই ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক পদকজয়ীরা উঠে আসবে—এমন প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।

সেন্ট প্ল্যাসিডস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রাদার স্যামুয়েল সবুজ বালা বলেন, গণিত উৎসব শিক্ষার্থীদের শুধু অঙ্ক শেখায় না, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায়। এ অভিজ্ঞতা আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, গণিতচর্চা মানে শুধু হিসাব নয়, এটি চিন্তার শক্তি বাড়ায়, সমস্যা সমাধানের সাহস দেয়। কৌতূহল আর অধ্যবসায় থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপক রঞ্জন বড়ুয়া বলেন, ‘গণিতচর্চা ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলে। এ কারণেই আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই আয়োজনের পাশে আছি।’

কৌতূহলের প্রশ্নে প্রাণ পেল প্রশ্নোত্তর পর্ব

উদ্বোধনের পর সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষে গণিতের পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষার পর উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ—প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা।

খুদে শিক্ষার্থী জুনায়েদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষকেরা বলেন, পৃথিবী ও চাঁদ একে অন্যকে আকর্ষণ করে, এটা সত্য। তবে পৃথিবী দ্রুত ঘোরে। এ ঘূর্ণনের ফলে সাগরে জোয়ার-ভাটা তৈরি হয়। জোয়ারের পানি চাঁদের ঠিক নিচে না থেকে সামান্য এগিয়ে যায়। এ এগিয়ে থাকা জোয়ার চাঁদকে বাড়তি টান দেয়। ফলে চাঁদ অল্প একটু বেশি গতি পায় এবং সেই গতি তাকে প্রতিবছর প্রায় ৩ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার করে পৃথিবী থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।

প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য প্যানেলে রয়েছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম মঈনুল হক মিয়াজী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) গণিত বিভাগের অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার দেব, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কমপিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক প্রণব ধর, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইফতেখার মনির ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ফারাহ জাহান।