
বর্ষা মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা মেলেনি। ফসলি মাঠে সেচ দেওয়ার জন্য খাল-বিলেও পর্যাপ্ত পানি নেই। সেচ কাজের জন্য প্রায় প্রতিটি ফসলের মাঠে গভীর নলকূপ চালু করা হয়েছে। তবে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের কালাইকুড়ি মাঠের একটি গভীর নলকূপ এখনো চালু করা যায়নি। সেচের পানি না পেয়ে আশপাশের মাঠের আমন ধানখেত নষ্টের আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
আপন দুই ভাই নিজাম উদ্দিন ওরফে বুলু ও মামুনুর রশিদ ওরফে লালুর মধ্যে মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বে গভীর নলকূপের ঘরে এখন তালা ঝুলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বিষয়টি সমাধানের জন্য ওই গভীর নলকূপের আওতাধীন কৃষকেরা ২০ আগস্ট উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে এরপর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কৃষকেরা এখনো কোনো সুফল পাননি। এর আগে ১৭ আগস্ট নিজাম ও মামুনুর নলকূপের ঘরে পাল্টাপাল্টি তালা লাগিয়ে দেন।
ভুক্তভোগী কৃষক ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গোপীনাথপুর ইউনিয়নের কালাইকুড়ি ফসলি মাঠে ৮০ দশকের শেষের দিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি গভীর নলকূপ বসানো হয়। ওই নলকূপের আওতায় প্রায় ১৮০ বিঘা জমি রয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর নিজাম ও মামুনুর পালাক্রমে দুই বছর করে গভীর নলকূপটি পরিচালনা করে আসছিলেন। ওই হিসেবে এ বছর নিজামের নলকূপ পরিচালনার কথা। তবে মামুনুর আবার এ বছর নলকূপ চালু করতে যান। এ নিয়ে তাঁদের দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে তাঁরা দুজনই নলকূপের ঘরে পাল্টাপাল্টি তালা মারেন। এতে সেচকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার কালাইকুড়ি ফসলি মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ওই নলকূপের ঘরে একসঙ্গে দুটি তালা ঝুলছে। কিছু আমন ধানের খেতে সামান্য বৃষ্টির পানি জমে আছে। তবে বেশির ভাগ জমিতেই পানি নেই। কোনো কোনো খেতের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।
কৃষক দোলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই মাঠে আমার দুই বিঘায় আমন ধান লাগানো রয়েছে। কিন্তু আমরা সেচের জন্য পানি পাচ্ছি না। বুলু আর লালু—দুজনই নলকূপের ঘরে তালা দিয়েছেন। উপজেলা সেচ কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল। সেচের কোনো ব্যবস্থা হলো না।’
কৃষক মন্টু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঠে আমার তিন বিঘা জমি আছে। পানির অভাবে খেত শুকায় গেছে। দুই দিন আগে সামান্য বৃষ্টি হইছে। জমি এখন একটু ভেজা আছে। দ্রুত সেচ দেওয়া না গেলে আবার জমি শুকায় যাবে।’
কৃষক মাহবুব আলম প্রথম আলোকে বলেন, দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব নিরসন না হওয়া পর্যন্ত গভীর নলকূপ চালু হচ্ছে না। এতে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগ নিয়ে প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো পক্ষকে ওই নলকূপ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জানতে চাইলে নিজাম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই বছর পর এবার নলকূপটি আমার পরিচালনার কথা। কিন্তু আমার ছোট ভাই নলকূপটি তার একক মালিকানা দাবি করেছে। এ কারণে আমি নলকূপের ঘরে তালা দিয়েছি।’
তবে মামুনুর রশিদ বলেন, পৈতৃক সম্পত্তি দুই ভাই ভাগ–বাঁটোয়ারা করে নিয়েছেন। গভীর নলকূপটি তাঁর ভাগে পড়েছে। তবে নলকূপ চালু করতে গেলে তাঁর বড় ভাই মালিকানা দাবি করছেন। গভীর নলকূপের সব কাগজপত্র তাঁর নিজের নামে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এই বিষয়ে উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম হাবিবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, নলকূপটি চালুর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপককে (ডিজিএম) সহযোগিতা করার জন্য বলা হয়েছে। তবে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। এর মধ্যে এক ভাই আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এসেছেন বলে জানা গেছে। এ কারণে এখন নলকূপ চালুর বিষয়ে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না।
জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দুই ভাইকে ইউপি কার্যালয়ে ডাকা হয়েছিল। কিন্ত কোনো সমাধান হয়নি। এ অবস্থায় নলকূপের ঘরের তালা খুলতে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার সম্ভাবনা আছে। এ কারণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া এ কাজ সম্ভব নয়।