মা সাজিমন বেওয়া ও মেয়ে ছকিনা বেগম। সম্প্রতি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর ভিতরবন্দ ইউনিয়নের কুমারপাড়ায়
মা সাজিমন বেওয়া ও মেয়ে ছকিনা বেগম। সম্প্রতি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর ভিতরবন্দ ইউনিয়নের কুমারপাড়ায়

মায়ের বয়স ৯৯, মেয়ের ৬১-অন্যের সহায়তায় চলে তাঁদের জীবন

ছাপরা ঘরের মেঝেতে বসে কাঁপছিলেন ৯৯ বছর বয়সী সাজিমন বেওয়া। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। কানে ভালো শোনেন না। অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটতেও পারেন না তিনি। তাঁর পাশে বসে ছিলেন ৬১ বছর বয়সী মেয়ে ছকিনা বেগম। মানুষের কাছে হাত পেতে যা পান, তা দিয়েই কোনোরকমে চলে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর কুমারপাড়ার এই মা-মেয়ের সংসার।

কুমারপাড়ায় একটি ছাপরা ঘরেই তাঁদের বসবাস। বৃষ্টি হলেই চালের ছিদ্র দিয়ে ঘরে পানি পড়ে। ঘরের পাশেই অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার।

প্রায় সাত বছর সংসারের পর ছকিনার স্বামী মারা গেলে শ্বশুরবাড়িতে তাঁর আর ঠাঁই হয়নি। তখন সাজিমন ভিক্ষা করে মেয়েকে খাওয়াতেন। এখন তাঁর শরীরে চলাফেরা করার মতো শক্তি নেই। তাই তাঁর দায়িত্ব এসে পড়ে ছকিনার ওপর। তাঁরও বয়স হয়েছে। তবু বৃদ্ধ মায়ের খাবারের জোগাড় করতে প্রতিদিন তাঁকে ভিক্ষা করতে বের হতে হয়।

ছকিনা বেগম বলেন, ‘আগে মা আমায় ভিক্ষা করে খাওয়াইছে, এখন আমি ভিক্ষা করি আনি আমার মাকে খাওয়াচ্ছি। ভিক্ষা পেলে খাই, না পেলে না খাইয়া থাকি। অনেক কষ্টে আমরা দিন পার করি।’

ছাপরা ঘরে মা-মেয়ের সংসার

নাগেশ্বরীর ভিতরবন্দ ইউনিয়নের কুমারপাড়ার বাসিন্দা সাজিমন। স্বামী উমর আলী, তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে ছিল তাঁদের সংসার। উমর আলী পদ্মপাতা সংগ্রহ করে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করতেন। সেই আয়েই চলত সংসার। ১৯৭৪ সালে স্বামী উমর আলী মারা যান। পরে মারা যান বড় মেয়েও। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে কঠিন অভাবের মধ্যে পড়েন তিনি। একমাত্র ছেলে বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে মায়ের কাছ থেকে দূরে চলে যান। দ্বিতীয় মেয়েও বিয়ের পর আর মায়ের খোঁজখবর নেননি। ছোট মেয়ে ছকিনা স্বামীর সংসার থেকে ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন।

বৃদ্ধা সাজিমন বেওয়া। সম্প্রতি নাগেশ্বরীর ভিতরবন্দ ইউনিয়নের কুমারপাড়ায়

কুমারপাড়ায় অন্যের যে জমিতে বসবাস করতেন একসময় সেই জমিও ছেড়ে দিতে হয়। পরে সাজিমনের মৃত বড় মেয়ের ছেলে রাশিদুল ইসলাম নিজের কেনা ছয় শতক জমির বসতভিটার এক পাশে নানি ও ছোট খালার জন্য একটি ছাপরা ঘর তুলে দেন। সেই ঘরেই এখন তাঁদের দিন কাটছে।

স্বজন বলতে এখন রাশিদুলই তাঁদের সবচেয়ে কাছের মানুষ। কিন্তু নিজের সংসারের টানাটানির কারণে নিয়মিত তাঁদের খরচ জোগানো তাঁর পক্ষেও সম্ভব হয় না। রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘দিনমজুরি করে খাই। নিজের সংসারই ঠিকমতো চালাইতে পারি না। তাই নানিকে তেমন সাহায্য করতে পারি না। খালা ভিক্ষা করে যা আনে, তা দিয়েই নানিকে খাওয়ায়। খুব কষ্টে আছে তারা।’

প্রতিবেশী আবেদা বেগম বলেন, ‘মা-মেয়ে দুজনই বুড়া মানুষ। এমার জায়গাজমি কিছুই নাই। হাটবাজারত মানুষের কাছে হাত পাতি একটা আলু, পেঁয়াজ, বেগুন যা পায়, তা-ই নিয়া আসে। যেদিন পায়, সেদিন খায়। না পাইলে না খায়া থাকে।’

‘ঘরত খাবার নাই, আমি কি খাই’

বয়সের ভারে সাজিমন এখন প্রায় অচল। একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠেন। একসময় এই নারীই স্বামী মারা যাওয়ার পর একাই সংসার সামলেছেন। এখন বয়সের ভারে নিজেই অন্যের ওপর নির্ভরশীল।

সাজিমন বলেন, ‘ঘরত খাবার নাই, আমি কি খাই। হাত-পা নুলা হয়া পড়ি আছি।’ নিজের হাত-পা দেখিয়ে তিনি বলেন, ব্যথায় হাত-পা অবশ হয়ে আসে। এ কারণে ঠিকমতো চলাফেরাও করতে পারেন না। ঘরের চালের টিনে ফুটো থাকায় বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। এ অবস্থায় ঘরে থাকা কঠিন।

বৃদ্ধা ছকিনা বেগম। সম্প্রতি নাগেশ্বরীর ভিতরবন্দ ইউনিয়নের কুমারপাড়ায়

স্থানীয় ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শফিউল আলম বলেন, সাজিমন ও ছকিনা দুজনই ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। সরকার থেকে পাওয়া বয়স্ক ভাতার টাকায় তাঁদের সংসার চলে না। আমরা যতটুকু পারছি, সহযোগিতা করছি। এখন অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে এ দুই বৃদ্ধ নারী শেষ বয়সে একটু সুন্দরভাবে বাঁচতে পারবেন।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মা-মেয়ের ভিক্ষা করে বেঁচে থাকার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর উপজেলা প্রশাসন তাঁদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। উপজেলা ত্রাণ তহবিল থেকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁদের এক মাসের খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন গত শুক্রবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বৃদ্ধ মা ও মেয়ের জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে ২ বস্তা চাল, শুকনা খাবার ও পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থবছরের বরাদ্দ পাওয়া গেলে তাঁদের জন্য ঘর করে দেওয়া হবে।