পথটি কুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে। সামনে খুব বেশি দূর দেখার উপায় নেই। দুই পাশে হাওরপারের বাড়িঘর ‘শিশিরের শব্দের মতো’ নির্জন-কুয়াশার চাদরে মোড়ানো। চারপাশে শান্ত-শিথিল নির্জনতা ঝিম ধরে আছে। আঁকাবাঁকা হয়ে পথটি গেছে একটি হাওরের দিকে।
তখন পুবের আকাশে কুয়াশার এই চাদর সরিয়ে সূর্য ভেসে উঠতে চাইছে। কাঁসার গোল থালার মতো লালচে রঙের সূর্যটা ঝুলছে কুয়াশার মায়াবী শূন্যতার ভেতর। সূর্যের রঙিন থালা থেকে ধূসর আলো ছড়িয়ে পড়ছে হাওরের বুকে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ছিকিরাইল এলাকাতে হাইল হাওরের বুকে তখন কুয়াশাজড়ানো ধূসর রঙিন সকালটি অনেকটা এ রকমই। একটু একটু করে চারপাশ জেগে উঠছে। জেগে উঠছেন হাওরপারের কৃষিজীবী মানুষ, মৎস্যজীবীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা পাখিসহ পরিযায়ী পাখিগুলোর পালকে তখন সকাল ফিরে আসার তাপ লাগতে শুরু করেছে। তারাও হাওরের এপাশ থেকে ওপাশে উড়ে উড়ে ঘুরছে। পথের পাশে জলাভূমির কাছে কচুরিপানার ওপর, ঝোপের মধ্যে, পাতাঝরা গাছের ডালে দু-একটা সাদা বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, চিল বসে আছে। ফুটে আছে নানা রকম বুনো ফুল।
শুক্রবার সকালে হাওরপারের বাড়িগুলো তখনো ঘুমিয়ে। হাওরপারের সেই স্থান থেকে পথের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অনেকগুলো মাছের খামার। এখন বোরোখেত চাষের সময়। বিভিন্ন স্থানে বোরো ফসলের চারা রোপণ শুরু হয়েছে। অনেক স্থানেই হালিচারার জমিকে মনে হয় সবুজ চাদরের মতো, যেন কেউ বিছিয়ে রেখেছে।
একটি খেতে কয়েকজন কৃষক রোপণের জন্য হালি চারা উত্তোলন করছেন। কোথাও চারা রোপণ করছেন কৃষক। কিছু খেতে এরই মধ্যে চারা রোপণ শেষ হয়ে গেছে। ধূসর কুয়াশায় সেই খেতগুলো ডুবে আছে।
একটি স্থানে মাছ ধরতে কয়েকজন সেচযন্ত্র লাগিয়ে ডোবার পানি শুকিয়ে নিচ্ছেন। পানি শুকানো হলে তাঁরা মাছ ধরবেন, চলছে সেই প্রস্তুতি। কেউ রাতের বেলা, নয়তো ভোরে হাওরের বিভিন্ন খাল-বিলে মাছ ধরে একা একা বাড়ি ফিরছেন।
কেউ সেঁউতি (পানি সেচার বাঁশ-বেতের যন্ত্র), কাকরাইন (বাঁশ-বেতের তৈরি মাছ রাখার পাত্র) কাঁধে ঝুলিয়ে হাওরের দিকে ছুটছেন। তাঁরা ‘খাইনজা (ছোট ছোট ডোবা)’ সেচ দিয়ে মাছ ধরবেন। নিজেদের খাওয়ার জন্য মাছ রেখে বাকিগুলো বিক্রি করতে পারেন।
তখন পুবের আকাশে সূর্য উঠতে শুরু করেছে। সূর্যের কুয়াশামাখা রঙিন-ধূসর আলোতে তখন চারপাশ ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। হাওরপারের পথের দুই পাশে কলমিলতার ফুল ফুটেছে। কোথাও লাল শাপলা ফুটেছে। ফুটেছে অনেক রকমের বুনো ফল।
বিলের জলে ভেসে আছে শাপলার পাতা। সেই শাপলাপাতায় শিশিরের ফোঁটা জমে টলমল করছে। কোথাও কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে ধ্যান ধরে বসে আছে বকপাখি।
কোথাও গাছের শুকনা ডালে, জলের মধ্যে পুঁতে রাখা বাঁশের খুঁটিতে বসে আছে একলা পানকৌড়ি, পানকৌড়ির দল, বক ও চিল। কোথাও দু-চারটে মাছরাঙা বসে আছে। আকাশের বুকে একা একা এক-দুইটা চিল উড়ছে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উড়ে চলছে পাতি সরালির ঝাঁক।
এবার এখনো শীতের পাখি (পরিযায়ী পাখি) তেমন একটা আসেনি। খুব অল্প কিছু পাখির দেখা মিলছে। মাঝেমধ্যে পাখি শিকার হচ্ছে বলেও জানালেন কেউ কেউ। পাখি শিকার রোধে সচেতনতাও আছে কারও কারও মধ্যে। পাখি শিকারে বাধা দেওয়া হয়, এ কথাও জানালেন তাঁরা। তখন যত দূর চোখ যায় কুয়াশামোড়া হাওরের খোলা দিগন্তটাকেই চোখে পড়ে।
আস্তে আস্তে বেলা বাড়ছে, হাওরের খোলা দিগন্ত যেন বুক খুলে আরও স্পষ্ট হচ্ছে। হাইল হাওরপারে শীতের সকাল তখন কুয়াশা, হিমেল বাতাস, ভোরের মিষ্টি রোদ আর শিশিরভেজা ঘাসে অন্য এক নির্জনতায় শান্ত স্নিগ্ধ হয়ে আছে। চঞ্চল হয়ে উঠছে।