
দেশলাইয়ের কাঠিগুলো পাশাপাশি বসানো। কোথাও সোজা, কোথাও আবার ঢেউখেলানো। কাঠির ফাঁকে ফাঁকে জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে রেশমি সুতা। দেবী দুর্গার শাড়ির কুঁচির অংশটিও সাজানো হচ্ছে কাঠির সারিতে। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কাপড়ের ভাঁজ আর ঝলমলে অলংকারেই সাজানো দেবীর পোশাক। কাছে গেলে অবশ্য ভুল ভাঙে—সবই তৈরি হচ্ছে দেশলাই কাঠি আর রেশমি সুতা দিয়ে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মন্দিরে চলছে এমন এক ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির কাজ। দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে দেবী দুর্গার পোশাক ও অলংকার। দুর্গাপূজা সামনে রেখে প্রতিমার কাজ দেখতে প্রতিদিনই মন্দিরে ভিড় করছেন স্থানীয় লোকজন।
গতকাল রোববার মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, মাটির তৈরি প্রতিমার অবয়বের ওপর একের পর এক দেশলাই কাঠি বসাচ্ছেন শিল্পীরা। কাঠির মাথার অংশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে অলংকার ও পোশাকের নকশা। কোথাও আবার কাঠির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে রেশমি সুতা। একটি কাঠি একটু এদিক-ওদিক হলেই নকশার সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা। তাই প্রতিটি কাঠি বসাতে সময় নিচ্ছেন প্রতিমাশিল্পীরা।
কাজের ফাঁকে প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বললেন, ‘তিন বছর আগে ভারতের এক মন্দিরে গিয়ে এ ধরনের কাজ দেখেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরিতে হাত দিয়েছি। পূজার আগে কাজ শেষ করতে দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে। কখনো রাত দুই-তিনটা পর্যন্তও কাজ করতে হয়।’
গত বছর ধানের প্রতিমা তৈরির পর থেকেই এবার আরও আকর্ষণীয় কিছু করার চিন্তা ছিল। সেই ভাবনা থেকেই দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যয় হবে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।কানাইলাল, উপদেষ্টা, পূজা উদ্যাপন কমিটি
আয়োজকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিমা তৈরিতে লাগছে দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা। শুধু প্রতিমা তৈরির শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। পূজার অন্যান্য খরচসহ এবার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।
ব্রহ্মরাজপুরে নতুন কিছু দিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন এবারই প্রথম নয়। গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল দুর্গাপ্রতিমা। সেই প্রতিমা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসেছিলেন। গত বছরের আয়োজনের সাড়া পেয়ে এবারও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা নেয় পূজা উদ্যাপন কমিটি।
কমিটির উপদেষ্টা কানাইলাল বলেন, ‘গত বছর ধানের প্রতিমা তৈরির পর থেকেই এবার আরও আকর্ষণীয় কিছু করার চিন্তা ছিল। সেই ভাবনা থেকেই দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছর প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। এবার সব মিলিয়ে ব্যয় হবে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।’
প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে আসেন অনেকে। তাদের একজন স্থানীয় বাসিন্দা কল্পনা রানী। তিনি আশা করছেন, গতবারের মতো এবারও সবাই দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার তৈরি দুর্গাপ্রতিমা দেখে মুগ্ধ হবেন।
সাতক্ষীরা জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ‘এবার দেশলাই কাঠি দিয়ে শিল্পীরা দেবী দুর্গার পোশাক ও অলংকারে যে নান্দনিকতা ফুটিয়ে তুলছেন, তা প্রশংসনীয়। আশা করছি এবারও সাতক্ষীরার বাইরে থেকেও দর্শনার্থীরা প্রতিমা দেখতে আসবেন।’