
কক্সবাজারের চকরিয়ায় ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ ইসফাতুল ইসলাম ওরফে জিসানকে পরিকল্পনা করে ভাড়াটে খুনি দিয়ে খুন করানো হয়েছে বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তির আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও এ তথ্য উঠে এসেছে।
আদালতে জবানবন্দি দেওয়া দুই ব্যক্তি হলেন চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের আনোয়ার হোসেন ওরফে কালু ড্রাইভার (৫০) ও রিংভং ছগিরশাহ কাটা এলাকার জিসাত মিয়া ওরফে শওকত (২৯)। গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে আনোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাঁকে আদালতে নেওয়া হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁর দেওয়া তথ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ২ অক্টোবর ভোরে জিসাত মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মাইক্রোবাস ও একটি আইফোন জব্দ করা হয়েছে। আজ সোমবার তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার শিকার ছাত্রদল নেতা ইসফাতুল ইসলাম জিসানের সঙ্গে গ্রেপ্তার দুজনের কারোরই কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্টতা নেই। তাঁরা এজাহারভুক্ত আসামিও নন। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীরা মূলত আনোয়ার হোসেনকে ভাড়া করেছিলেন। আনোয়ারের মাধ্যমেই জিসাত মিয়াসহ পাঁচ–ছয়জন খুনি এতে যুক্ত হন। তবে তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এখনই সবার নাম প্রকাশ করেনি।
আজ দুপুরে চকরিয়া থানায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জিসান হত্যার বিভিন্ন বিষয় সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরনে চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আবদুল আজিজ ও থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান।
চকরিয়া সহকারী পুলিশ সুপার মো. আবদুল আজিজ বলেন, জিসান হত্যার ঘটনায় আনোয়ার হোসেন আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও ‘কিলিং মিশনে’ অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জিসাত মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিসাতের কাছ থেকেই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মাইক্রোবাস (নোয়াহ গাড়ি) ও আইফোন জব্দ করা হয়েছে। তাঁরা দুজনই ভাড়াটে খুনি।
পুলিশের ভাষ্য, মামলার তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
হত্যার পরিকল্পনা যেভাবে
পুলিশ বলছে, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি রেজিয়া সুলতানার সঙ্গে জিসানের সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে ব্যবসার জন্য জিসানকে টাকা দেন রেজিয়া। পরে টাকা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে রেজিয়ার ভাই বিদেশে অবস্থানরত মিজানুর রহমানের সঙ্গে জিসানের ফোনে কথা–কাটাকাটি হয়। এ সময় জিসানকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
এরপর বিদেশে থাকা মিজানুরসহ অন্য আসামিরা জিসানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আনোয়ার হোসেনের মাধ্যমে চকরিয়ার মালুমঘাট এলাকার ভাড়াটে হত্যাকারী সংগ্রহ করা হয়।
২৭ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকার ছাবের সওদাগরের দোকানের সামনে থেকে সাদা রঙের একটি নোয়াহ গাড়িতে করে জিসানকে তুলে নেওয়া হয়। প্রায় চার ঘণ্টা পর রাত তিনটার দিকে খুটাখালী ইউনিয়নের মেধাকচ্ছপিয়া এলাকার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে একটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা সেটি জিসানের বলে শনাক্ত করেন। জিসান কাকারা ইউনিয়ন ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
এ ঘটনায় জিসানের বড় ভাই কাইচার হামিদ বাদী হয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর চকরিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় রেজিয়া সুলতানা, তাঁর ভাই নাজেম উদ্দিন, তাঁর স্ত্রী পপি আকতার, রেজিয়ার ভাই মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ জকরিয়া, মিনহাজ উদ্দিন, তাঁদের নিকটাত্মীয় এ কে তারেকসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, জিসান হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যার নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা এবং কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।