ভুক্তভোগী অনেক গ্রাহক ডাকঘরের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। গত বৃহস্পতিবার রাজবাড়ী জেলার প্রধান ডাকঘরের সামনে
ভুক্তভোগী অনেক গ্রাহক ডাকঘরের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। গত বৃহস্পতিবার রাজবাড়ী জেলার প্রধান ডাকঘরের সামনে

গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে উধাও ডাকঘরের ‘লেটার রাইটার’

রাজবাড়ী জেলার প্রধান ডাকঘরের এক ‘লেটার রাইটার’ এর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি জানাজানির পর থেকে অভিযুক্ত ‘লেটার রাইটার’ শিহাব মৃধা পলাতক। ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা অর্থ ফেরতের দাবিতে প্রধান ডাকঘরে ধরনা দেওয়াসহ অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেছেন।

‘লেটার রাইটার’ স্থায়ী বা রাজস্বভুক্ত কোনো পদ নয়। তবে কোনো কোনো ডাকঘরে কাজের সুবিধার জন্য লেটার রাইটার নামে কোনো ব্যক্তিকে অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজে লাগানো হয়।

অভিযুক্ত ও পলাতক শিহাব মৃধা রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের বাসিন্দা।

গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভুক্তভোগী অনেক গ্রাহক ডাকঘরের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। গ্রাহকেরা জরুরি ভিত্তিতে তাঁদের অর্থ ফেরতের দাবি জানান। গ্রাহকদের অভিযোগ, মেয়াদি সঞ্চয় হিসাব খোলার জন্য ডাকঘরে গেলে কর্মকর্তারা ‘লেটার রাইটার’ শিহাব মৃধার কাছে পাঠাতেন। শিহাব বিভিন্ন সময়ে স্লিপের মাধ্যমে গ্রাহকদের টাকা গ্রহণের পর সঞ্চয় বই পরে দেওয়ার আশ্বাস দিতেন। এমন ৬০ জনের বেশি গ্রাহকের কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করে শিহাব উধাও হয়েছেন। তবে এ ঘটনায় ইতিমধ্যে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শহরের নতুন বাজার এলাকার গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, অনেক কষ্টে দুই লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। সাদা কাগজের স্লিপ ধরিয়ে কয়েক দিন পর তাঁকে আসতে বলা হয়। পরে জানতে পারেন, শিহাব মৃধা গ্রাহকদের টাকা মেরে পালিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার প্রধান ডাকঘরের বারান্দায় স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার উড়াকান্দা গ্রামের খোকন শেখ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন অনেক কষ্টে দুই লাখ টাকা জমান। সম্প্রতি সেই টাকা ডাকঘরে স্ত্রীর নামে জমা দিতে কাউন্টারে গেলে তাঁরা লেটার রাইটার শিহাব মৃধার কাছে পাঠান। তিনি তাঁর কাছে টাকা জমা দেন। এরপর কয়েকবার জমা বই নিতে এসেছেন। যতবার আসেন, প্রতিবার বলা হয়, ‘বই হয়নি, পরে আসেন।’ এখন জানতে পারেন তাঁদের টাকাই জমা হয়নি।

অভিযুক্ত শিহাব মৃধা বর্তমানে পলাতক

গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিনটেনডেন্টকে (তদন্ত) সদস্যসচিব এবং খুলনা ও কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়। এ ছাড়া কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয় থেকেও চার সদস্যের পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কুষ্টিয়া বিভাগীয় তদন্ত কমিটির সদস্য কুষ্টিয়া ডাকঘরের পরিদর্শক (প্রশাসক) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন না। অন্তত ৬০ জন গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। তদন্তের পাশাপাশি টাকা উদ্ধার করে ভুক্তভোগীদের ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার লক্ষণদিয়া গ্রামের বৃদ্ধ সনৎ বিশ্বাস বলেন, ‘গায়ের রক্ত জল কইরা দুই লাখ ট্যাকা জমাইছিলাম। সেই ট্যাকা এখন আর নাই। চোখে শুধু অন্ধকার দেখতাছি।’

সম্প্রতি সদর উপজেলার রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের শিহাব মৃধার বাড়িতে দেখা যায়, একতলা একটি পাকা ঘর। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ও ছোট ভাই ছাড়া কেউ নেই। অভিযুক্ত শিহাব বাড়িতে না থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ।

শহরের রেলগেট এলাকার চা–দোকানি প্রণব সাহার এক লাখ টাকা গত ৬ মে ডাকঘরে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য জমা দেন। এ সময় তাঁকে জানানো হয়, সার্ভার সমস্যায় তাৎক্ষণিকভাবে মেসেজ যাবে না। পরে ‘লেটার রাইটার’ শিহাব মৃধা স্লিপ হাতে ধরিয়ে দেন। কিন্তু তাঁর মেসেজ আর আসেনি।

সম্প্রতি সদর উপজেলার রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের শিহাব মৃধার বাড়িতে দেখা যায়, একতলা একটি পাকা ঘর। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ও ছোট ভাই ছাড়া কেউ নেই। অভিযুক্ত শিহাব বাড়িতে না থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ। শিহাবের ছোট ভাই মাহবুব মৃধা বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে অফিসে যাওয়ার কথা বলে ভাই বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি।’

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত ৬০ জনের বেশি গ্রাহক এসেছেন। সে হিসেবে কোটি টাকার মতো আত্মসাৎ হয়েছে বলে ধারণা করছেন। বিষয়টি কুষ্টিয়া বিভাগীয় অফিসকে অবহিত করলে ১৩ জুলাই কুষ্টিয়া থেকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা এলে ‘লেটার রাইটার’ শিহাব মৃধা কৌশলে পালিয়ে যান।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রাজবাড়ী জেলা শাখার উদ্যোগে সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণে দাবিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।