অবৈধভাব সার মজুত ও বিক্রির বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। গত বুধবার দুপুরে দিনাজপুর শহরের পুলহাট এলাকায়
অবৈধভাব সার মজুত ও বিক্রির বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। গত বুধবার দুপুরে দিনাজপুর শহরের পুলহাট এলাকায়

খড়ের গাদায় ডিলারের সার ‘মজুত’, বাজারে সংকট

সার হাতবদল হয়ে কৃষক পর্যায়ে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

দিনাজপুরে কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার বাজারে না দিয়ে গুদামে মজুত করে রাখার অভিযোগ উঠছে অনেক নিবন্ধিত সার ডিলারের বিরুদ্ধে। কেউ মুরগির বিষ্ঠার বস্তার সঙ্গে, কেউ খড়ের গাদায় লুকিয়ে রেখেছেন সার। এমনকি সরকারি গুদাম থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বিপুল পরিমাণ সার বিক্রির অভিযোগে জেলহাজতে গেছেন খোদ গুদামরক্ষকসহ ডিলারের কয়েকজন প্রতিনিধি।

সম্প্রতি দিনাজপুরের কয়েকটি উপজেলায় জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ২০টির বেশি অভিযান চালিয়েছেন। এ সব অভিযানে ৩২৭ মেট্রিক টন সার গুদাম থেকে সরিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। জব্দ করা হয়েছে প্রায় ৪৫০ মেট্রিক টন সার। ভ্রাম্যমাণ আদালত সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন ছয়জনকে। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) গুদামরক্ষক আকতারুল ইসলামও (৩৫) রয়েছেন।

এসব অভিযানের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, সরকারি বা বরাদ্দ করা সার নির্ধারিত ব্যবস্থাপনার বাইরে নিয়ে গুদামজাত করা হয়েছে। কৃষি বিভাগ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো কোনো ডিলার কৃষকদের কাছে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। পরে চাহিদার সুযোগ নিয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। আবার বেশি লাভের আশায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ফড়িয়াদের কাছেও বিক্রি করছেন কেউ কেউ। সেই সার হাতবদল হয়ে কৃষক পর্যায়ে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

গত সপ্তাহে পাঁচ দিন দিনাজপুর সদর, কাহারোল, বীরগঞ্জ ও খানসামা উপজেলা ঘুরে নিবন্ধিত সার ডিলার, খুচরা সার বিক্রেতা, প্রান্তিক কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় চাহিদার তুলনায় সারের বরাদ্দ কম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিলারদের অনিয়ম, সরকারি গুদাম ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি, ফড়িয়া ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য, কৃষকের অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রবণতা ও বরাদ্দের বাইরে মাছের পুকুরে কৃষির সার ব্যবহারের বিষয়টি।

ডিলারের ঘরে সার নেই, বেশি দামে কিনছেন কৃষক

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দিনাজপুরে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বিএডিসির সার বিক্রির নিবন্ধিত ডিলার ৩০২ জন। আর কৃষি অফিসের নিবন্ধিত খুচরা সার বিক্রেতার সংখ্যা ৪৫৪। নিবন্ধনহীন খুচরা বিক্রেতা আছেন আরও ৭০০ জন। সরকার নির্ধারিত মূল্যে ইউরিয়া ও টিএসপি প্রতি বস্তার মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ১৫০ ও এমওপি ১ হাজার ৫০ টাকা। শর্ত অনুযায়ী, বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা লাভ রেখে কৃষক পর্যায়ে সার বিক্রি করার কথা ডিলারদের; কিন্তু বাস্তবে প্রান্তিক কৃষকেরা অনেক ক্ষেত্রে ডিলারের ঘরে সার পাচ্ছেন না। তাঁদের যেতে হচ্ছে খুচরা দোকানে। সেখানে ১ হাজার ৩৫০ টাকার এক বস্তা সার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দামে।

গত ২৬ আগস্ট দিনাজপুর শহরের পুলহাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি পরিত্যক্ত হাস্কিং মিলের গুদাম থেকে ২১৭ বস্তা সার জব্দ করা হয়। জব্দ করা সারের মালিক হিসেবে মনোহর নামের এক ব্যক্তির নাম আসে। তিনি দাবি করেন, সারগুলো কাহারোল উপজেলার সোনালী ট্রেডার্সের মালিক নাঈমের। ১৮ আগস্ট তিনি এসব সার উত্তোলন করেছেন। তবে নাঈম মুঠোফোনে জানান, ওই সার তাঁর নয়।

ডিলারের ঘরে সার নেই। বাধ্য হয়েই খুচরা দোকান থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
হাফিজউদ্দিন, কৃষক

পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে অবৈধভাবে সার মজুতের কথা স্বীকার করেন মনোহর। তিনি জানান, কয়েকজন ডিলারের কাছ থেকে তিনি এই সার কিনেছেন। পরে সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬–এর ১২(৩) ধারায় তাঁকে ১ মাস ১৫ দিনের কারাদণ্ড এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খানসামা উপজেলার একজন সার ডিলার বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় কিছু ডিলারের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য, কিছু ডিলার গুদাম থেকে সার তোলার পর ফটকেই বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা লাভ রেখে অর্ধেক বিক্রি করে দেন। দিনাজপুরে খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ জনের একটি ফড়িয়া শ্রেণি গড়ে উঠেছে, যাঁরা মুঠোফোনে সার কেনাবেচা করেন। আবার অনেক ডিলার আছেন, যাঁরা ফড়িয়াদের কাছে টাকা নিয়ে সার উত্তোলন করেন। তাই ফড়িয়াকেও সুবিধা দিতে হয়। কোনো কোনো ডিলার নিজেই নির্দিষ্ট গুদামের বাইরে অন্যত্র সার মজুত করেন।

ওই ডিলার বলেন, নিয়ম হচ্ছে সার উত্তোলনের পর কৃষি অফিসে জানাতে হবে। কৃষি অফিসের লোক বস্তা গুনে দেখে অ্যারাইভাল রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই রিপোর্ট সরেজমিন স্বাক্ষর করা হয় না। এখানে ডিলারদের সঙ্গে কৃষি অফিসের লোকজনের একটা বোঝাপড়া থাকে।

২০টি দোকান, একটিতেও সার নেই

দিনাজপুরের বীরগঞ্জের শতগ্রাম ইউনিয়নের ঝাড়বাড়ী বাজারে খুচরা সার ও কীটনাশক বিক্রির ২০টি দোকান রয়েছে। গত সোমবার বিকেলে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কোনো দোকানেই সার নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘পুরো ইউনিয়নে আমনসহ প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে এই মৌসুমে আবাদ হচ্ছে। সেখানে সরকারি হিসাবে টিএসপি বরাদ্দ পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৭৫ মেট্রিক টন। অথচ কৃষি অফিসের নিয়মে সার প্রয়োগ করলে এই পরিমাণ জমিতে টিএসপির প্রয়োজন কমপক্ষে ২৫০ মেট্রিক টন।

এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘সরকারি সারের বরাদ্দই কম। আমরা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, হাওর অঞ্চল থেকে মিডিয়ার (ফড়িয়া) মাধ্যমে সার এনে বিক্রি করি। সে ক্ষেত্রে লাভ তো একটু বেশি রাখবই। তা ছাড়া অনেক কৃষক আছেন সার বাকিতে নেন, ফসল উঠলে টাকা দেন। এই হিসাবটাও আমাদের করতে হয়।’

কাহারোল উপজেলার একজন ব্যবসায়ী (নিবন্ধনহীন) বলেন, ‘মূলত এই মৌসুমে হাওর অঞ্চলে সারের চাহিদা কম। আমরা সেসব এলাকা থেকে সার আনি। কেউ কেউ ডিলারের কাছে সার নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে এটা ঠিক; কিন্তু সেটা তো সীমিত। কয়েক দিন ধরে যে অভিযান শুরু হয়েছে, তাতে কেউ সার আনার সাহস পাচ্ছে না। এমন চললে সামনে আলুর মৌসুমে সারের সংকট আরও বাড়বে।’

এদিকে ওই উপজেলার কৃষক হাফিজউদ্দিন বলেন, ‘দুই দিন ঘুরেও টিএসপি পাইনি। মাসখানেক আগে টিএসপি কিনেছি ৪০ টাকা কেজি।’ তাঁর ভাষ্য, খরচ বাড়ছে; কিন্তু কী আর করার! ডিলারের ঘরে সার নেই। বাধ্য হয়েই খুচরা দোকান থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ ‘অপ্রতুল’

দিনাজপুরের একটি উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খরিপ-২ মৌসুমে (১০ জুলাই থেকে ১৫ অক্টোবর) ওই উপজেলায় ৩৩ হাজার ৩৪৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩২০ জন কৃষক। এর মধ্যে শুধু রোপা আমনের আবাদ হচ্ছে ২৯ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে। এসব জমির জন্য ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে চাহিদা দেওয়া হয়েছিল ১৬ হাজার ১২২ মেট্রিক টন। বিপরীতে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৬ হাজার ৮৯৭ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশই কম।

তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দিনাজপুরে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের চাহিদা ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ১১৫ মেট্রিক টন এবং সেই পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

জেলা কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত কয়েক বছরে অনেক জমি এক ফসলি থেকে তিন ফসলি হয়েছে। উৎপাদনও বেড়েছে কয়েক গুণ। অথচ প্রতিবছর সারের বরাদ্দ কমেছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তব চাহিদা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। আসন্ন ভুট্টা ও আলুর মৌসুমে সারের সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তাঁর।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও সার বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব আফজাল হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার এক হাজার টন সারের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তাহলে প্রান্তিক কৃষক সার পাচ্ছেন না কেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে সমীক্ষা করে মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হলেও অনেক সময় আগের বছরের সার ব্যবহারের ভিত্তিতে বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়। অতিরিক্ত সার ব্যবহার করে বেশি ফলন পাওয়ার ধারণা থেকেও কৃষকেরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার ব্যবহার করছেন বলে মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।

আফজাল হোসেন আরও বলেন, ‘আমরা কৃষককে জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি মাটি পরীক্ষা করে সার প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছি এবং কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার নির্ধারিত ডিলার ও অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কৃষকের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’