
লোকজ সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য পালাকার ও লোকসংগীতশিল্পী ইসলাম উদ্দিন পালাকারকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আজ শনিবার দুপুরে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের নোয়াবাদ ইউনিয়নের দর্গাভিটা বাজারে খ্যাতিমান এ পালাকারের কার্যালয়ে গিয়ে ক্রেস্ট ও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান দলটির কেন্দ্রীয় সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) ও কিশোরগঞ্জ জেলা কমিটির আহ্বায়ক শেখ খায়রুল কবির।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০২৬ সালের একুশে পদকে ভূষিত করেছে সরকার। এর মধ্যে নাট্যকলা বিভাগে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক এ সম্মাননা পেয়েছেন ইসলাম উদ্দিন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে একুশে পদক গ্রহণ করেন তিনি।
দর্গাভিটা বাজারে ইসলাম উদ্দিনকে সংবর্ধনা জানাতে গিয়ে এনসিপি নেতা খায়রুল কবির বলেন, ‘ইসলাম উদ্দিনের কণ্ঠে শুধু সুর নয়, আছে গ্রামের ইতিহাস। আছে মানুষের সুখ-দুঃখ। তাঁর গানে উঠে আসে মাটির গল্প, প্রেম আর বেদনার গল্প। তাঁকে সরকার যে একুশে পদক দিয়েছে, আমরা এলাকাবাসী খুবই খুশি। চার দশকের বেশি সময় ধরে ইসলাম উদ্দিন পালাগানকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছেন এই ঐতিহ্য। একুশে পদক পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য ছিল।’
স্ত্রী–সন্তানদের নিয়ে করিমগঞ্জের নোয়াবাদ গ্রামে থাকেন ইসলাম উদ্দিন পালাকার। তাঁর বড় দুই ভাই যাত্রাদলে অভিনয় করতেন, মুগ্ধ হয়ে দেখছেন ইসলাম উদ্দিন। অভিনয়ের নেশা তখনই মাথায় চেপে বসে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মঞ্চে ওঠেন ইসলাম উদ্দিন। একসময় তাঁর গানের জাদু নজরে আসে হাওর অঞ্চলের আরেক বিখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী কুদ্দুস বয়াতির। তিনি ইসলাম উদ্দিনকে শিষ্য করে নেন। শুরু হয় কঠিন সাধনা। ওস্তাদের বাড়িতে থেকে ‘কিচ্ছাগান’ রপ্ত করেন। গানই হয়ে ওঠে ইসলাম উদ্দিনের জীবন। ১৯৮৯ সালে নিজের পালাগানের দল গড়েন তিনি। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম, এক জেলা থেকে আরেক জেলা ঘুরতেন। পালাগানের হাত ধরে আসে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। পালাগানই তাঁর পেশা, ভালোবাসা।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইসলাম উদ্দিন দেশীয় সংস্কৃতির মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন বিদেশের মাটিতেও। ১৯৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে পালাগান করেছেন। ফ্রান্স ও ভারতেও মঞ্চ কাঁপিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি প্রশিক্ষক ছিলেন। সিনেমায় গান করেছেন। তাঁর কণ্ঠের জাদুতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ‘দেওড়া’ গানটি। এটি গাওয়ার পর তিনি নতুন প্রজন্মের কাছেও হয়ে উঠেছেন পরিচিত মুখ।
ইসলাম উদ্দিনের পরিবেশিত পালাগানের মধ্যে রয়েছে, ‘কমলা রাণীর সাগর দিঘি’, ‘জাহাঙ্গীর বাদলা’, ‘মতিলাল’, ‘রূপকুমার’ ‘উথুলা সুন্দরী’, ‘কাকাধরের খেলা’, ‘আমির সাধু’, ‘সুন্দর মতি’, ‘রাম বিরাম’, ‘ফিরোজ খাঁ’–সহ আরও অনেক।
নোয়াবাদ ইউনিয়নের দর্গাভিটা বাজারে ছোট একটি ছবি তোলার স্টুডিও আছে ইসলাম উদ্দিনের। এটি তাঁর অবসরের বাণিজ্য। পুরস্কারের খবর জানাজানি হওয়ায় সেখানে প্রতিদিন ভিড় করছেন মানুষ। কেউ ফুল নিয়ে আসছেন, কেউ এসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। ইসলাম উদ্দিন বলছেন, ‘এই সম্মান আমার একার না। গ্রামের সবার।’
একুশে পদক পাওয়ায় সরকার ও দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইসলাম উদ্দিন। পালাগান সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একেকটি পালাগান চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার হয়ে থাকে। এগুলোতে অনেক চরিত্র থাকে, সব চরিত্র আমি একা গাই। নেচে-গেয়ে নানা অঙ্গভঙ্গিতে চলে গান। পরিশ্রম অনেক। পালাগান আমার কাছে বহু কষ্টের ধন। তাই আমি চাই, এই পালাগান যেন বিলুপ্ত হয়ে না যায়। আমি না থাকলেও পালাগান যেন টিকে থাকে।’