চার বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছে অনন্যা চক্রবর্তী। মা সীমা ভট্টাচার্য অনেক কষ্টে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন। সেই অনন্যা এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর কুশুলিয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। পড়তে চায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে।
আজ রোববার সকালে সাতক্ষীরা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে অনন্যা বলে, ‘মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।’
অনন্যার মতো সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যামনগর থেকে অনুষ্ঠানে এসেছে অভিজিৎ রায়। নকিপুর সরকারি হরিচরণ পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে সে জিপিএ–৫ পেয়েছে। সাতক্ষীরা–শ্যামনগর সড়কের দুরবস্থার কারণে সময়মতো পৌঁছাতে পারবে কি না, এই দুশ্চিন্তায় দাদি সুষমা গায়েনকে নিয়ে আগের রাতেই শহরে ভাইয়ের বাড়িতে চলে আসে সে। অভিজিৎ বলে, ‘ভালো ফল করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হতে চাই।’
‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে রোববার সকালে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজন করা হয় শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা ২০২৬। জেলার সাত উপজেলার শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়।
সকালে সাতক্ষীরার রাজ্জাক পার্কে গুড়পুকুরের মেলার স্টলগুলো ছিল জমজমাট। সেই ভিড় পেরিয়ে একে একে শিল্পকলা একাডেমির দিকে যাচ্ছিল জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা। কারও সঙ্গে বাবা-মা, কেউ এসেছে ভাই-বোনের সঙ্গে। কেউ পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে জড়িয়ে ধরছিল, কেউ দল বেঁধে ছবি তুলছিল। সকাল সাতটা থেকেই হলুদ টি-শার্ট পরে তাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিলেন প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা। সকাল সাড়ে আটটার আগেই শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। বন্ধুসভার সদস্য শেখ শরীফ হাসানের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি ইমতিয়াজ উদ্দীন।
অনুষ্ঠানে সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ বাসুদেব বসু বলেন, জিপিএ-৫ জীবনের শেষ সাফল্য নয়, নতুন পথচলার শুরু। শুধু ভালো শিক্ষার্থী নয়, সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।
নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠ এবং সাহিত্য ও সাধারণ জ্ঞানচর্চায় গুরুত্ব দিয়ে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল হাসেম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, মুঠোফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হবে পড়াশোনার কাজে। জিপিএ-৫ পাওয়ার পরের পথ আরও কঠিন, সেখানে পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মুস্তাক আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান।
অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলতে শপথ করান প্রথম আলোর ডেপুটি নিউজ এডিটর তুহিন সাইফুল্লাহ। তিনি বলেন, এসএসসির পর শুরু হচ্ছে শিক্ষাজীবনের আরও প্রতিযোগিতামূলক অধ্যায়। বন্ধু ও পরিবেশ বেছে নিতে এবং সাইবার অপরাধের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। পরে কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন সাতক্ষীরা বন্ধুসভার সাংস্কৃতিক সম্পাদক শিরিনা আক্তার। নৃত্য পরিবেশন করেন সাতক্ষীরা বন্ধুসভার সদস্য তনয়া মেধা শায়নী। সবশেষে শিল্পী চৈতালী মুখার্জি ও আবু আফফান রোজ বাবুর গানে আনন্দে মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরা।
প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশের ৬৪ জেলায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় আছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।