চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পরিবহন দপ্তর থেকে চাঁদা না পেয়ে ছাত্রলীগের করা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রায় ৩ কোটি ২৯ লাখ ১৩ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য গঠিত কমিটি। গত মঙ্গলবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৫তম সিন্ডিকেট কমিটির সভায় আলোচনার পর বিষয়টি সামনে এসেছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে শাটল ট্রেনের ছাদে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৬ শিক্ষার্থী আহত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাত ১২টার দিকে ৬৫টি যানবাহন, উপাচার্যের বাসভবন, শিক্ষক ক্লাব এবং পুলিশ বক্সে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এই ভাঙচুরে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় আলাদা দুটি মামলা করে কর্তৃপক্ষ।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, উপাচার্য ও পরিবহন দপ্তর থেকে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এতে ‘পুঁজি’ করা হয়েছে শাটল ট্রেন দুর্ঘটনাকে। মামলায় ভাঙচুর, চাঁদা দাবি, হত্যার চেষ্টা ও চুরির অভিযোগ আনা হয়। দুটি মামলায় ৭ জন করে ১৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জনই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী।
গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণের জন্য ১০ সেপ্টেম্বর সাত সদস্যর একটি কমিটি করে কর্তৃপক্ষ। এতে মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক সজীব কুমার ঘোষকে আহ্বায়ক ও উপহিসাব নিয়ামক মাসুদুর রহমান চৌধুরীকে সদস্যসচিব করা হয়।
এ কমিটির সদস্যরা ১৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে সিন্ডিকেট সভা না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে কেউ কথা বলতে এত দিন রাজি হননি। মঙ্গলবার রাতে সিন্ডিকেট সভায় প্রতিবেদন অনুমোদন হওয়ার পর এ সম্পর্কে জানা গেছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কমিটির সদস্যরা ছয়টি স্থানে ভাঙচুরের কথা উল্লেখ করেন। এগুলো হলো উপাচার্যের বাসভবন, নিরাপত্তা দপ্তর, মূল ফটক, অতিথি ভবন, শিক্ষক ক্লাব ও নিরাপত্তা দপ্তর। এসব জায়গার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পরিবহন দপ্তরে। ছোট বড় ৪৮টি গাড়ি ভাঙচুরের মেরামত বাবদ ক্ষতি ধরা হয়েছে ২ কোটি ৮২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।
অন্যদিকে উপাচার্যের বাসভবনের আসবাব, ফ্রিজ, এসি, টেলিভিশন ইত্যাদি ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষতি ধরা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। শিক্ষক ক্লাব ভাঙচুরের ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা, অতিথি ভবন ভাঙচুরে ২ লাখ ৮ হাজার টাকা, প্রধান ফটকে পুলিশ বক্স ভাঙচুরে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ও নিরাপত্তা দপ্তরে ভাঙচুরে ক্ষতি হয়েছে ১৭ হাজার টাকা।
কমিটির আহ্বায়ক সজীব কুমার ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, ভাঙচুরের ঘটনাস্থল সরেজমিনে বিশ্লেষণ ও জিনিসপত্রের বাজারদর যাচাই করে ক্ষয়ক্ষতির এ পরিমাণ তাঁরা নিরূপণ করেছেন।
সিন্ডিকেট সদস্য মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কমিটির প্রতিবেদন সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত হয়েছে। প্রতিবেদনের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে চাহিদা দেওয়া হবে।
ভাঙচুরের ঘটনায় প্রশাসনের করা দুটি মামলার এজাহারে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ১২ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো বিভিন্ন সময় আসামিদের সঙ্গে নিয়ে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন, মিছিল করেছে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পক্ষ।
মামলার আসামিরা এখনো ক্যাম্পাসে থাকছেন। এরপরও কাউকে কোনো গ্রেপ্তার করা হয়নি এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি। তিনি অবরোধের কারণে ব্যস্ত আছেন জানিয়ে থানার এসআই (তদন্ত) সুমন দেবনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। পরে সুমন দেবনাথের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে ভাঙচুরের এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেনি এখনো। ঘটনার পর ১০ সেপ্টেম্বর জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পাঁচ সদস্যর কমিটি গঠন করেছিল কর্তৃপক্ষ। এতে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বশির আহাম্মদকে আহ্বায়ক ও সহকারী প্রক্টর সৌরভ সাহাকে সদস্যসচিব করা হয়েছিল। তবে এ কমিটি এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ বশির আহম্মদ বলেন, তদন্তের কাজ চলছে। শিগগির তাঁরা প্রতিবেদন জমা দেবেন। তবে কবে নাগাদ দেবেন এমন প্রশ্নে কোনো তারিখ বলতে পারেননি তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নূরুল আজিম সিকদার বলেন, তাঁরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। দ্রুত জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।