দুর্গাপূজা সামনে রেখে প্রতিমায় রঙের কাজে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পী অমৃত পাল। পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বাজার কালীমন্দিরের পূজামণ্ডপে
দুর্গাপূজা সামনে রেখে প্রতিমায় রঙের কাজে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পী অমৃত পাল। পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বাজার কালীমন্দিরের পূজামণ্ডপে

পাবনায় প্রতিমাশিল্পীদের সুনাম বাড়লেও আয় বাড়েনি

গত দুই-তিন বছরে প্রতিমা তৈরির উপকরণ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে অনেক। এতে আয় কমেছে প্রতিমাশিল্পীদের।

প্রতিমার মুখের শেষ কাজটুকুতে ব্যস্ত পাবনার বেড়া উপজেলার মালদাপাড়া গ্রামের প্রতিমাশিল্পী ষষ্ঠী পাল। পাশে বসে বাবাকে সহযোগিতা করছেন ছেলে অমৃত পাল। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে প্রতিমা তৈরির কাজ শিখেছেন অমৃত। এখন বাবার মতোই দক্ষ হয়ে উঠেছেন তিনিও। বাবা-ছেলে মিলে এবার ৯টি দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করছেন। এর মধ্যে চারটি বেড়া উপজেলায়। বাকি পাঁচটি বানাচ্ছেন পাবনা শহর ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায়।

গত শুক্রবার বেড়া বাজার কালীমন্দিরে কথা হয় ষষ্ঠী পাল ও অমৃত পালের সঙ্গে। তাঁরা সেখানে ৫৫ হাজার টাকায় একটি প্রতিমা তৈরি করছেন। প্রতিমা তৈরি করে এলাকায় বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। তবে এই সুনামের সঙ্গে তাঁদের আয় বাড়েনি। উল্টো গত দুই-তিন বছরে প্রতিমা তৈরির উপকরণ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে অনেক।

বেড়ায় ষষ্ঠী পালের মতো এমন সুপরিচিত প্রতিমাশিল্পী রয়েছেন ১৫ জন। তাঁরা উপজেলার মালদাপাড়া, আমিনপুর ও চরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। এসব শিল্পীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আরও ২০ থেকে ২৫ জন। তাঁদের তৈরি প্রতিমার চাহিদা শুধু বেড়া বা পাবনায় নয়, সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও। মুখ ও চোখের নিখুঁত কাজ, প্রতিমার সুন্দর গড়ন, হাত-পায়ের সঠিক অনুপাত, রঙের কাজ এবং দেবীর মুখে আলাদা সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার দক্ষতার কারণে তাঁদের সুনাম রয়েছে। সময়মতো প্রতিমা বুঝিয়ে দেওয়া এবং বছরের পর বছর আয়োজকদের সঙ্গে সম্পর্কও তাঁদের চাহিদা বাড়িয়েছে।

বেড়া উপজেলার মালদাপাড়া গ্রামের আরেক খ্যাতিমান প্রতিমাশিল্পী ধনু পাল (৬৬) প্রায় ৫০ বছর ধরে প্রতিমা তৈরি করছেন। এবার তিনি বেড়া থেকে পাবনা শহরে গিয়ে ৯টি ও সুজানগর উপজেলায় গিয়ে একটি মিলিয়ে মোট ১০টি প্রতিমা তৈরি করছেন।

ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে কাজ করতে করতে শিখেছি। কাজটা আমাদের কাছে শুধু ব্যবসা নয়, শিল্পও। কিন্তু খরচ যেভাবে বাড়ছে, প্রতিমার দাম সেভাবে না বাড়লে এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন।
অমৃত পাল, প্রতিমাশিল্পী

ধনু পাল বলেন, ‘প্রতিমা তৈরি আমার নেশা। সবাই যখন আমার বানানো প্রতিমা দেখে সম্মান দেখায়, তখন আনন্দ আর গর্বে বুক ভরে ওঠে।’ তিনি আরও বলেন, একেক মণ্ডপে একেক ধরনের প্রতিমা তৈরি করতে হয়। আবার এক বছরের প্রতিমার সঙ্গে পরের বছরের প্রতিমারও যেন মিল না থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়। এ জন্য প্রতিমা তৈরির আগে অনেক চিন্তা করতে হয়। এটি সৃষ্টিশীল কাজ, যেখানে মেধাও খাটাতে হয়। প্রতিমার মুখ, সাজসজ্জা, পটভূমিসহ সবকিছু তৈরিতেই বেড়ার শিল্পীদের আলাদা দক্ষতা রয়েছে। এ কারণেই তাঁদের প্রতিমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে এই খ্যাতির সঙ্গে আয় বাড়েনি শিল্পীদের। ষষ্ঠী পাল জানালেন, বেড়া বাজার কালীমন্দিরের জন্য প্রতিমা তৈরি করতে ১২ থেকে ১৫ দিন লাগবে তাঁদের। তাঁদের হিসাবে বাঁশ, খড় ও মাটিতে ১০ হাজার, রঙে ৫ হাজার, অন্যান্য উপকরণে ৫ হাজার, শ্রমিকের মজুরিতে ২০ হাজার এবং পরিবহনে ৩ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। মোট খরচ ৪৩ হাজার টাকা।

প্রতিমাশিল্পীরা জানান, সবকিছুর দাম বেড়েছে। এবার ৫৫ হাজার টাকায় যে মানের প্রতিমা তৈরি করছেন, গত বছর একই ধরনের প্রতিমা তৈরি করেছেন ৫০ থেকে ৫২ হাজার টাকায়।

হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ হাজার টাকার প্রতিমায় ১২ হাজার টাকা থাকার কথা। কিন্তু এতে বাবা-ছেলের ১২ থেকে ১৫ দিনের শ্রমের মূল্য ধরা হয়নি।

ষষ্ঠী পাল বলেন, ‘বাঁশ, খড়, রং, গয়না, চুলসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। সব খরচ বাদ দিলে যে টাকা থাকে, তা আমাদের দুজনের শ্রমের দামও নয়।’

দুর্গাপূজার জন্য প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পী অমৃত পাল। পাবনার বেড়া বাজার কালীমন্দিরে

প্রতিমাশিল্পীরা জানান, দুই-তিন বছর আগে খড়ের দাম ছিল প্রতি মণ ৩০০ টাকা, এখন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। ২০০ টাকার বাঁশের দাম হয়েছে ৪০০ টাকা। ৫০০ টাকার গয়নার সেট কিনতে এখন লাগে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। পাটের তৈরি প্রতিমার মাথার চুলের দাম প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০০ টাকা। অথচ এবার ৫৫ হাজার টাকায় যে মানের প্রতিমা তৈরি করছেন, গত বছর একই ধরনের প্রতিমা তৈরি করেছেন ৫০ থেকে ৫২ হাজার টাকায়।

অমৃত পাল বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে কাজ করতে করতে শিখেছি। কাজটা আমাদের কাছে শুধু ব্যবসা নয়, শিল্পও। কিন্তু খরচ যেভাবে বাড়ছে, প্রতিমার দাম সেভাবে না বাড়লে এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন।’

বেড়ার প্রতিমাশিল্পীদের খ্যাতি আশপাশের কয়েকটি জেলাজুড়ে। এ কারণে তাঁদের অনেকেই বেড়ার বাইরে গিয়ে প্রতিমা বানিয়ে সুনাম আনছেন। কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এবার উপকরণের দাম বাড়ায় তাঁদের খুব একটা লাভ থাকছে না।
সমীরণ চৌধুরী, সভাপতি, বারোয়ারি হরিবাড়ি মন্দির কমিটি

প্রতিমাশিল্পী ও তাঁদের সহযোগীরা দুর্গাপূজার সময় ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে মাটির সামগ্রী তৈরি করেন। তবে এসব সামগ্রীর আগের মতো চাহিদা নেই। এতে সারা বছর মাটির সামগ্রী তৈরি করে এখন আর তাঁদের সংসার চলে না। দুর্গাপূজার কয়েক মাসের প্রতিমা তৈরির কাজের আয়ের ওপরই তাঁদের বড় ভরসা।

বেড়া উপজেলার কেন্দ্রীয় বারোয়ারি হরিবাড়ি মন্দির কমিটির সভাপতি সমীরণ চৌধুরী বলেন, ‘বেড়ার প্রতিমাশিল্পীদের খ্যাতি আশপাশের কয়েকটি জেলাজুড়ে। এ কারণে তাঁদের অনেকেই বেড়ার বাইরে গিয়ে প্রতিমা বানিয়ে সুনাম আনছেন। আমাদের মন্দিরে ষষ্ঠী পাল ও তাঁর ছেলে অমৃত পাল প্রতিমা বানাচ্ছেন। দুজনেই অসাধারণ প্রতিমাশিল্পী। কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এবার উপকরণের দাম বাড়ায় তাঁদের খুব একটা লাভ থাকছে না।’