বনবিবির মন্দিরে চলছে পুঁথি পাঠ ও প্রার্থনা। বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার কয়রা উপজেলার চরামুখা গ্রামে
বনবিবির মন্দিরে চলছে পুঁথি পাঠ ও প্রার্থনা। বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার কয়রা উপজেলার চরামুখা গ্রামে

অরণ্যের দেবী বনবিবির পূজা: পুঁথির ছন্দে বেঁচে থাকার প্রার্থনা

‘বিপদে পড়িয়া বনে যে জনে ডাকে,

মা বলিয়া বনবিবি দয়ার মা তাকে

উদ্ধারিও তারে তোর আপনার গুণে...’

একটানা ছন্দে পুঁথিপাঠ চলছে। চারপাশে গোল হয়ে বসে আছেন বনজীবী নারী-পুরুষ। এটি কেবল তাঁদের কাছে পুঁথিপাঠ নয়, বিশ্বাস, ভরসা ও বেঁচে থাকার প্রার্থনা। সামনে মন্দিরের ভেতর বনবিবির থান (বেদি)। তাঁর নারীমূর্তির পাশে ভাই শাহ জঙ্গলি, গাজী আউলিয়া, শিশু দুঃখে ও বনবিবির দুই চাচা ধনাই ও মনাই। একটু দূরে দক্ষিণ রায়—বাঘের প্রতীকী মূর্তি।

বৃহস্পতিবার খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন চরামুখা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এই দৃশ্য। সুন্দরবন উপকূলের মানুষের বিশ্বাস, বনবিবি অরণ্যের দেবী। বাঘ, কুমিরসহ সব হিংস্র প্রাণী তাঁর অনুগত। তাই প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে কয়রার সুন্দরবনঘেঁষা গ্রামগুলোতে হয় বনবিবির পূজা ও মেলা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কয়রার চরামুখা গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে উৎসবের রং। কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ঘেঁষে বনবিবির মন্দির, সামনে খোলা মাঠজুড়ে মেলার আয়োজন। মন্দিরে নারী-পুরুষের ভিড়। কেউ পুঁথিপাঠ শুনছেন, কেউ প্রসাদ নিচ্ছেন, কেউ নীরবে প্রার্থনায় মগ্ন। প্রার্থনা শেষে মানুষ ঢুকছেন মেলা প্রাঙ্গণে। মন্দিরের সামনের মাঠ আর বেড়িবাঁধের পাশে দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সাজিয়েছেন পসরা—খাবার, খেলনা, মৃৎশিল্পসহ নানা পণ্যে জমজমাট বেচাকেনা।

বনবিবি মন্দিরের সভাপতি ভোলানাথ মাঝি বলেন, চরামুখা গ্রামে ১২৮৩ বঙ্গাব্দ থেকে প্রতিবছর পয়লা মাঘে বনবিবির পূজা ও মেলা হয়ে আসছে। বনবিবি সুন্দরবন উপকূলের বনজীবীদের মনে ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রতীক। বনে গিয়ে যেন নিরাপদে ফেরা যায়, ভালো আয় হয়—এই কামনাতেই আদিকাল থেকে এই পূজা হয়।

মন্দির থেকে বেরিয়ে কথা হয় স্থানীয় বনজীবী সুভাষচন্দ্র মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাঘ-কুমিরসহ সব জন্তু বনবিবির কথা মানে—এইডাই আমাগের বিশ্বাস। জন্মের পর থেইকে আমরা মা বনবিবির পূজা কইরে আসটিছি। তাঁর আশীর্বাদে বিপদ কাটে।’

চরামুখা বনবিবি মেলার অন্যতম আয়োজক স্বরূপ মাঝি বলেন, একসময় এই এলাকায় বাঘের অত্যাচার ছিল। তখন তাদের বংশের পূর্বপুরুষ মধু মাঝি স্বপ্নে বনবিবির নির্দেশ পান পূজা দেওয়ার। সেই থেকেই মন্দির স্থাপন ও মেলার সূচনা। তিনি বলেন, ‘বংশপরম্পরায় আমরা এই আয়োজন করছি। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে যুগ যুগ ধরে এই উৎসব চলছে। মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে এই দিনের জন্য।’

বনবিবির পূজা করছেন একজন ভক্ত। বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার কয়রা উপজেলার চরামুখা গ্রামে

চরামুখা ছাড়াও কয়রার ঘড়িলাল, ১ নম্বর কয়রা, বানিয়াখালী, নয়ানীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে একই চিত্র। গ্রামবাসীরা মণ্ডপ তৈরি করে পুঁথি পাঠের মধ্য দিয়ে বনবিবিকে স্মরণ করছেন। কয়রা নদীর তীরবর্তী নয়ানী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মন্দিরে চলছে বনবিবির পূজার বয়ান। পুরোহিত নীলকণ্ঠ মিস্ত্রি ছন্দে ছন্দে পড়ছেন ‘বনবিবি জহুরানামা’—বনবিবির মায়া, শিশু দুখের উদ্ধারের কাহিনি, বনজীবীদের রক্ষার আখ্যান।

মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে নয়ানী গ্রামের শিবপদ মণ্ডল বলেন, ‘আমাগের গ্রামে ১০০ বছরের বেশি সময় ধইরে এই পূজা হয়ে আসটিছে। আগে সুন্দরবনের ভেতর গিয়ে বনবিবির থান বানায়ে পূজা হুতো। কিন্তু এখন গ্রামেই আয়োজন করা হচ্ছে। শত শত মানুষ নিয়ে বনে ঢোকা এখন বড্ড ঝুঁকির কাজ।’

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে সুন্দরবন অঞ্চলে বনবিবিসহ আরও কাহিনি প্রচলিত ছিল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ তাঁর ‘সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার আগমনের মধ্য দিয়েই সুন্দরবনে বনবিবি-সংক্রান্ত কাহিনির বিকাশ ঘটে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বনজীবীদের কাছে বনবিবি হয়ে ওঠেন সুন্দরবনের রানি ও অভিভাবক।