
কুমিল্লা নগরের প্রায় দেড় শ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৌর ভবন, যা পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে রূপ নেয়। বর্তমান স্থানেই ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক নগর ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক মতবিরোধে এখন তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের আপত্তিতে নগর ভবন নির্মাণের দরপত্রের কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রয়েছে। তিনি ভবনটিকে নগরের দক্ষিণ এলাকায় নেওয়ার দাবি তুলেছেন। যদিও নগরের বেশির ভাগ মানুষ বর্তমান স্থানেই আধুনিক নগর ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ অবস্থায় নগর ভবন নিয়ে সংসদ সদস্য ও সিটি প্রশাসকের মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি এ নিয়ে কুমিল্লা নগরের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কুমিল্লা নগর ভবনের অতীন্দ্র মোহন রায় সম্মেলনকক্ষে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. রবিউল ইসলামের উপস্থিতিতে ওই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আশা করছি, আজ স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি বুঝতে পেরেছেন, কুমিল্লার মানুষ কোথায় নগর ভবন চায়। দেড় শ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্থানেই আধুনিক নগর ভবন দেখতে চায় কুমিল্লাবাসী।ইউসুফ মোল্লা, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সাধারণ সম্পাদক, মহানগর বিএনপি
সভায় নগর ভবন কোথায় নির্মিত হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষ তাদের অবস্থান তুলে ধরে। সেখানে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী বর্তমান স্থানেই নতুন ভবন নির্মাণের পক্ষে মত দেন। সভায় সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু), প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সায়েম ভূঁঞা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত কমিটির সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার প্রতিনিধিরা বলেন, ১৮৬৪ সালের ৩০ নভেম্বর যে স্থানে কুমিল্লা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই স্থান থেকেই দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও নাগরিক সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে নতুন আধুনিক নগর ভবনও একই স্থানে নির্মাণ করা উচিত।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা পৌরসভা ও সদর দক্ষিণ পৌরসভাকে একীভূত করে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে সিটি করপোরেশনের আয়তন ৫৩ দশমিক শূন্য ৪ বর্গকিলোমিটার। সম্প্রতি কুমিল্লা সিটি করপোরেশন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এটি বাস্তবায়িত হলে সিটি করপোরেশনটির আয়তন হবে প্রায় ২৮৫ বর্গকিলোমিটার। এতে কুমিল্লা আদর্শ সদর ও সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় একটি অংশ সিটি করপোরেশনে যুক্ত হবে।
আজ সভার শুরুতে উপসচিব রবিউল ইসলাম বলেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা বর্তমান স্থানেই নতুন নগর ভবন নির্মাণের পক্ষে আবেদন করেছেন। অন্যদিকে কুমিল্লা–৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী নগরের দক্ষিণাঞ্চলের ছোট ধর্মপুর এলাকায় নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন। দুই পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ সরেজমিন তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, নগরের আয়তন বাড়ছে, নতুন সীমানার কথা মাথায় রেখেই সবার জন্য সুবিধাজনক স্থানে ভবন নির্মাণের কথা বলেছি। ভবন হোক তাতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি কুমিল্লা সদরের নির্বাচিত এমপি। নগর ভবনের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, আমার সঙ্গে ন্যূনতম পরামর্শ পর্যন্ত করা হয়নি। বর্তমান প্রশাসন নগর ভবন করার কেউ নয়, এটা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাজ।মনিরুল হক চৌধুরী, সংসদ সদস্য, কুমিল্লা–১ আসন
এরপর সভায় বর্তমান স্থানে নতুন ভবন নির্মাণের পক্ষে বক্তব্য দেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান, কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি জহিরুল হক (দুলাল), আবুল হাসনাত (বাবুল), মাসুক আলতাফ চৌধুরী, টাউন হলের সদস্যসচিব সাজ্জাদুল কবীর, মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক শওকত আলী (বকুল), মহানগর মহিলা দলের সভাপতি রায়হান রহমান হেলেন, মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নাহিদ রানাসহ অনেকে। সভাকক্ষের বাইরে অবস্থান নেওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষও বর্তমান স্থানেই নগর ভবন নির্মাণের দাবি জানান।
অন্যদিকে ছোট ধর্মপুর এলাকায় ভবন নির্মাণের পক্ষে মত দেন সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর খলিলুর রহমান মজুমদার ও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আখতার হোসাইন। যদিও সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, নগর ভবনের ওই সভায় দক্ষিণের মানুষদের নাজেহাল করা হয়েছে এবং তাদের কথা বলতে দেওয়া হয়নি। এ জন্য তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান স্থানে নগর ভবন নির্মাণের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কুমিল্লা–৬ আসনের বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তাঁর দেওয়া ডিও লেটারের কারণে স্থানীয় সরকার বিভাগ ৪ জুন নতুন নগর ভবন নির্মাণসংক্রান্ত টেন্ডার কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়। এর আগে গত ১৮ মে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ১২৫ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫ তলা ফাউন্ডেশনের একটি আধুনিক নগর ভবন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করেছিল।
সিটি করপোরেশনের একটি সূত্র জানায়, সংসদ সদস্য যে স্থানে নগর ভবন নির্মাণের কথা বলছেন, সেই ছোট ধর্মপুর এলাকাটি ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাছাকাছি স্থানে অবস্থিত। বর্তমানে সেখানে সিটি করপোরেশনের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এলাকাটি বিলুপ্ত কুমিল্লা সদর দক্ষিণ পৌরসভার অংশ। নগরের অধিকাংশ বাসিন্দার জন্য ওই স্থানে যাতায়াতের সুযোগ–সুবিধা সীমিত। আজ নগর ভবনে তদন্ত শেষে উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম প্রস্তাবিত স্থানটি পরিদর্শন করেন।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা প্রথম আলোকে জানান, ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা ও নগরের কেন্দ্রীয় অবস্থানের কারণে বর্তমান স্থানই নগর ভবনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কিন্তু সংসদ সদস্যের চিঠির কারণে দরপত্রের প্রক্রিয়া স্থগিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আশা করছি, আজ স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি বুঝতে পেরেছেন, কুমিল্লার মানুষ কোথায় নগর ভবন চায়। দেড় শ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্থানেই আধুনিক নগর ভবন দেখতে চায় কুমিল্লাবাসী।’
আজ সন্ধ্যায় বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান স্থানে তো একটি ভবন আছেই; সেখানে আরেকটি এখনই করতে হবে কেন? বর্তমান ভবনে তো কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না, কিন্তু নগরে অনেক জরুরি সমস্যা আছে, যেগুলো আগে ভবন নির্মাণের আগে সমাধান করা দরকার। এ ছাড়া বর্তমান প্রশাসক নির্বাচিত নন, তিনি নিয়মিত দায়িত্ব সামলাবেন। আগামী তিন মাস পর নির্বাচন। নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলররা ঠিক করবেন নতুন নগর ভবন কোথায় হবে। বর্তমান নগর ভবনটিও শহরের উত্তর কোণায় অবস্থিত; মানুষ সেখানে যেতে চরম দুর্ভোগে পড়ে।
মনিরুল হক আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, নগরের আয়তন বাড়ছে, নতুন সীমানার কথা মাথায় রেখেই সবার জন্য সুবিধাজনক স্থানে ভবন নির্মাণের কথা বলেছি। ভবন হোক তাতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি কুমিল্লা সদরের নির্বাচিত এমপি। নগর ভবনের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, আমার সঙ্গে ন্যূনতম পরামর্শ পর্যন্ত করা হয়নি। বর্তমান প্রশাসন নগর ভবন করার কেউ নয়, এটা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাজ।’