সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট। গত রোববার নগরের ঝালোপাড়ায়
সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট। গত রোববার নগরের ঝালোপাড়ায়

সিলেট নগরে চাহিদার অর্ধেক পানিও মেলে না, গরমকালে সংকট আরও বাড়ে

সিলেট নগরের ৪২টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন পানির চাহিদা ১২ কোটি লিটার। এর বিপরীতে সিটি করপোরেশন মাত্র সাড়ে ৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে পারছে। এতে দুর্ভোগে আছেন নগরবাসী। তাঁরা দ্রুত সুপেয় পানির সংকট দূর করার দাবি জানিয়েছেন।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালে ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দার এই নগরে ৪২টি ওয়ার্ড রয়েছে। করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর ২৫, ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু অংশে পানির সংযোগ লাইন স্থাপন করা হলেও পানি স্বল্পতার কারণে এসব ওয়ার্ডে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। পুরোনো ২৪টি ওয়ার্ডে বর্তমানে গ্রাহকদের জন্য পানির চাহিদা প্রতিদিন ৫ কোটি লিটার। তবে এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে ৪ কোটি লিটার।

অন্যদিকে ২০২১ সালে নতুনভাবে সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত ১৫টি ওয়ার্ড ও পুরোনো ৩টি ওয়ার্ডে (২৫, ২৬ ও ২৭ নম্বর) দৈনিক পানির চাহিদা রয়েছে ৭ কোটি লিটার। তবে নতুন ওয়ার্ডগুলোতে এখনো পানির সংযোগব্যবস্থাই চালু হয়নি। পুরোনো ওয়ার্ডগুলোতে বর্তমানের পানির গ্রাহক আছেন ২০ হাজার ৫৪ জন। তবে নগরের সচেতন বাসিন্দাদের দাবি, সিটি করপোরেশনের হিসাবের চেয়েও পানির চাহিদা আরও বেশি।

মেজরটিলা এলাকার বাসিন্দা হাসানুজ্জামান (৫৬) বলেন, ২০২১ সালে মেজরটিলা এলাকা সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলেও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। জনদাবি থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বর্ধিত ওয়ার্ডগুলোতে পানির সংযোগ লাইন স্থাপন করা হয়নি। বাসিন্দারা সুপেয় পানির সংকটে থাকলেও সমস্যা সমাধানে সিটি কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। এতে বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নলকূপ ও গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে কোনোরকমে মানুষ চাহিদা মেটাচ্ছেন।    

সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ শাখা জানিয়েছে, বর্তমানে কুশিঘাট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং ৪৫টি উৎপাদক নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন সাড়ে ৪ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করা হচ্ছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত ৮ হাজার ২৫২টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবেও মানুষজন পানি উত্তোলন করছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে পানি উত্তোলনের হিসাব সিটি করপোরেশনের মোট পানির চাহিদার তথ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে কী পরিমাণ পানি উত্তোলন হচ্ছে, এটাও করপোরেশনে সংরক্ষিত নেই।

৪২টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন পানির চাহিদা ১২ কোটি লিটার। এর বিপরীতে সিটি করপোরেশন মাত্র সাড়ে ৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে পারছে।

নগরের কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গরম বেশি পড়লেই লোডশেডিং বেশি হয়। এতে পানির সংকট বেড়ে যায়। এ সময় সিটি করপোরেশন চাহিদামতো পানি সরবরাহ করতে পারে না। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চলতি মৌসুমে যথাসময়ে সিটি কর্তৃপক্ষ পানি সরবরাহ করতে পারছে না। এ ছাড়া কোনো এলাকায় একবার, কোনো এলাকায় দুইবার সিটি কর্তৃপক্ষ পানি সরবরাহ করছে। সেটাও আবার প্রতিদিন সঠিক সময়েও দিতে পারছে না। এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন গ্রাহকেরা।
সিটি করপোরেশনের পানি শাখার সহকারী প্রকৌশলী এনামুল হক তাপাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নগরে এখন সেই অর্থে পানির সংকট নেই। সিটি করপোরেশন তো সরবরাহ করছেই, অনেকে করপোরেশনের অনুমোদন নিয়ে নলকূপ স্থাপন করেও পানি উত্তোলন করছে। তবে আরেকটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি নির্মিত হলেই সংকট পুরোপুরি দূর হবে বলে আশা করছি।’

কলাপাড়া ও শেখঘাট এলাকার চারজন বাসিন্দা জানান, এ দুই এলাকায় পানির তীব্র সংকট। এখানে সিটি করপোরেশন পর্যাপ্ত পানিও সরবরাহ করতে পারছে না। অনেক এলাকায় প্রতিদিন দুইবার পানি সরবরাহ করলেও এ দুটো এলাকায় মাত্র একবার করে পানি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এতে বাসিন্দারা দুর্ভোগে আছেন।

আমি যোগদানের পর থেকেই পানির সংকট দূর করতে নতুন আরেকটি ট্রিটমেন্ট প্ল্যাট স্থাপনে উদ্যোগী হই। সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ দ্রুতই শুরু হবে।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক

নগরের বাসিন্দারা জানান, পুরোনো যে ২৪টি ওয়ার্ডে সিটি কর্তৃপক্ষ পানি সরবরাহ করে থাকে, এসব ওয়ার্ডের অধিকাংশ এলাকাতেই কমবেশি পানির সংকট আছে। সাধারণত দিনে দুইবার পানি দেয় সিটি করপোরেশন। অবশ্য উপশহর, সোনারপাড়া, লামাপাড়া, শিবগঞ্জসহ কিছু এলাকায় দৈনিক একবার পানি সরবরাহ করা হয়। তবে বৈদ্যুতিক বিভ্রাট হলে সুনির্দিষ্ট সময়সূচিতেও পরিবর্তন হয়। এমনকি পর্যাপ্ত পানি তোলার আগে সরবরাহও বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার অনেকে অবৈধভাবে লাইন দিয়েও পানি নিয়ে যাচ্ছেন। এসব কারণেও ভোগান্তি বাড়ে।

এদিকে সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ শাখা সূত্রে জানা গেছে, পানির সমস্যা সমাধানের জন্য শহরতলির চেঙ্গেরখাল নদীতে একটি পানি শোধনাগার বাস্তবায়নে সব ধরনের প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বর্ধিত ওয়ার্ডগুলোতেও পানি সরবরাহের কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করে আরেকটি পানি শোধনাগার তৈরি করার পরিকল্পনাও সিটি করপোরেশনের আছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে গত ২২ ফেব্রুয়ারি যোগ দিয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি যোগদানের পর থেকেই পানির সংকট দূর করতে নতুন আরেকটি ট্রিটমেন্ট প্ল্যাট স্থাপনে উদ্যোগী হই। সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ দ্রুতই শুরু হবে। এটা হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে চাহিদা অনুসারে পানি সরবরাহের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। সেই অনুযায়ী আমরা কাজও করছি।’